2015 Nov, Immigrant Diary-CBET 2, ইমিগ্রান্ট কড়চা (বৃত্তিঃ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ), আসমা খান

460

Immigrant Diary, Asma Khan;  ইমিগ্রান্ট কড়চা (বৃত্তিঃ স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ),  আসমা খান

১৮ই অক্টোবর CBET  এর  third Fund raising dinner হয়ে গেল।
আমাদের জন্মভুমি যেখানে আমাদের নাড়িপোতা, যেখানে আমরা হেসেখেলে বড় হয়েছি, হটাৎ একদিন সব ছেড়েছুড়ে স্বেচ্ছায় ইমিগ্রান্ট হিসেবে কানাডা চলে এলাম, বসবাস শুরু করলাম, পাঁচমিশেলি সমাজে প্রতিষ্ঠিত হলাম।  দিন যাপনের অভিজ্ঞতায় নুতন কত কিছু জমা করলাম। মন কিন্তু হাহাকার করছে, যোগসুত্র খুজছে জন্মভুমি আর বাসভুমির দুরত্বের শুন্যস্থান পূরন করার মাধ্যম। যেকোন উছিলায় দেশ মনে আসে, বাবা মায়ের অতীত স্মৃতি চারন করি, ছেলে মেয়ের কাছে, পরের প্রজন্মের কাছে । আমরাই হচ্ছি আমাদের অতীত বর্তমান আর ভবিষ্যতের মধ্য যোগাযোগ পরস্পরা। জীবন বড় ক্ষণিক, বড় অতৃপ্ত, অসম্পুর্ন, বড় মায়াময় এবং দায়বদ্ধ। সেই মায়ায় মানবিক যে কাজগুলি মানুষ করে সেটাই হচ্ছে জীবনের সাথে জগতের সেতু। আমাদের জন্মভূমি আর বাসভূমির সাথে যোগাযোগের ঐ রকম একটি সেতু হচ্ছে CBET!


CBET 3rd FRD ST Elias Banquet Hall Oct 18, 2015

পৃথিবীর যেকোন দেশের যেকোন দুর্যোগে কানাডার ত্রানসংস্থাগুলি সাহাজ্যর হাত বাড়িয়ে দেয়। এবাবদ সারাবছর তারা আমজনতার কাছ থেকে দান সংগ্রহ করে। CBET এমন একটি কানাডিয়ান দাতব্য প্রতিষ্ঠান (Registered non-profit & Charitable organisation) রেজিস্ট্রার্ড চ্যরিটি ট্যাক্স রিসিট দিতে পারে, ফলে দাতা বছর শেষে ট্যক্স ফাইলের পর সরকার দানের ৩০% অর্থ দাতাকে ফেরত দেয় দানকে উতসাহিত করার জন্য। সিবেট অটোয়া এবং বাংলাদেশের কলেজ সমূহে মেধাবী কিন্তু অর্থনৈতিক প্রতিকূলের ছাত্র ছাত্রিদের এককালীন বৃত্তি দেয়।  তরুণ দরিদ্র ছাত্রের অর্থনৈতিক যুদ্ধটা বড় নির্মম,বড় কস্টের হয়, কিন্তু তাদেরও জীবনে সফল হবার স্বপ্নটা মনে খোদাই করা থাকে, উপযুক্ত শিক্ষাই তাকে সেই স্বপ্ন জয়ের সম্ভাবনা দেয়, সিবেট বৃত্তি সেই স্বপ্ন সম্ভাবনাকেই উসকে দিচ্ছে!!

অন্যান্য ডিনার পার্টির মতই উৎসবমুখর ব্যাংকয়েট হলে সুসজ্জিত দাতাগন টিকিট কেটে আসেন। সময়মত অনুষ্ঠান শুরু ও শেষ, মাল্টি-এথনিক অতিথিবৃন্দ, চমতকার বক্তা ডঃ যিযাদ ডেলিচ যখন বলতে শুরু করলেন দানের মহাত্ব্য দাতাদের মন ছুয়ে গেল। ছোট্ট কিন্তু সুন্দর বক্তব্য রেখেছেন প্রসিডেন্ট, ভাইস-প্রসিডেন্ট, সেক্রটারী জেনারেল। যেকোন অনুষ্ঠানে এম সির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন। সাবীন ও ফাহিম সফলতার সাথে সে দায়িত্ব পালন করেছে। টেবিলেই সময়মত মজার খাবার পরিবেশিত হয়েছে, সাথে নাবিলা, মিঠুন, অজান্তার সুরেলা গলায় হামদ, নাত।

এই একটি রাতের ফসল সম্ভারের জন্য বছরভর সমবেত পরিকল্পনা ও পুর্বপ্রস্তুতি নিতে হয়েছে স্বেচ্ছাশ্রমে। হলবুকিং, টিকেট বিক্রি, গন্যমান্যদের নিমন্ত্রন, কানাডিয়ান মাল্টিকালচারাল চেহারাকে ধরে রাখা, দাতাদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্য ছিমছাম মনোজ্ঞ অনুষ্ঠান্সূচী, প্রযুক্তির সার্থক ব্যাবহার যেমন শ্রুতিমধুর সাউন্ড সিস্টেম, মনোরম আলোক সম্পাত, টিভি ক্যামেরা(রজার্স টিভি), প্রযেক্টর, আর সবচেয়ে জরুরী হচ্ছে ক্রেডিট কার্ড প্রসেসিং অটোমেটিক ব্যাংক টার্মিনাল। সেতুর অপর প্রান্তের বাংলাদেশকে (স্লাইড শো) কানাডাতে পরিচিত করা। মাত্র এক’শ পঁচাত্তর ডলার দান করে দাতাদের উতসাহিত করা একটি বৃত্তি দিয়ে বাংলাদেশের গাঁও গেরামের একটি জীবন বদলে দিতে।
স্লোগানঃ ‘শিক্ষায় দান করে একটি জীবন বদলে দাও’।

টেবিলে যখন মিস্টি দেয়া হচ্ছে, তখন হলো ডেভিডের ‘Auction’, একজনের দান করা সুন্দর কাজ করা এক শেরওয়ানী নিলামে তোলা হোল, শুধু কন্ঠস্বরের ওঠানামায় মানুষকে মোহবিস্ট করে রাখলেন ডেভিড, একজন অতিথী খুশিমনে কিনে নিলে,এ অর্থও গেল ডোনেশনে। অনুষ্ঠান শেষে ঘরে ফেরার সময় তৃপ্ত কানাডিয়ান পাঁচমিশালি অতিথী  দেখে মনে হয়েছে এই অটোয়াতে বসেও সেই সুদূর বাংলাদেশের অজানা অচেনা ভাগ্যাহত কিছু তরুন তরুণীর জীবন বদলের স্বপ্ন সম্ভাবনায় অবদান রাখতে পেরে্ তাঁরা খুশিই হুয়েছেন। এটাই মানবিকতা।।

দুইঃ
আমাদের বাসার কাছের প্রাইমারী স্কুলটি কানাডার ২৬তম গভর্নর জেনারেল এন্দ্রিয়্যান্ এল, ক্লার্ক্সনের নামে। সকুলের জিমেই জাতীয় প্রাদেশীক বা মিউনিসিপালিটির সব ভোট দেয়া নেয়া হয়। ফেডারেল ইলেকশন ১৯ শে অক্টোবর কর্ম দিবশ, স্কুলও খোলা, ক্লাসে ক্লাসে ছেলে পিলেরা মনোযোগে পড়াশোনা করছে একই সাথে এলাকাবাসী হাতের কাজের ফাঁকে চট করে ভোট দিয়ে নাগরিক দায়িত্ব পালন করছেন কোনরকম হুল্লোর ছাড়াই। হেমন্তের রঙ্গিন পাতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্ল্যাকার্ড দিয়ে রাস্তার মোড়ে মোড়ে সাজিয়েছেন ভোটপ্রার্থী সন্মানিত ক্যান্ডিডেটগন। ভোটের ঢের আগে বাই পোস্টে ভোটিং কার্ড চলে আসে যার যার ঠিকানায়। আমরা সকালেই ভোট দিয়ে দিনের কাজ গুছিয়ে নিচ্ছি যাতে রাতে টিভির সামনে বসে ইলেকসনের রেজাল্ট দেখতে পারি।

বিকেল থেকে ঝুম বৃস্টি। এর মধ্য কে যেন কলিং বেল টিপল। সদর দরজা খুলে দেখি পৌঢ় ইন্ডিয়ান এক দম্পতি ছাতা মাথায় দাঁড়িয়ে। একগাল হেসে আপন জনের মত বললেন ‘চলো ভোট দিয়ে আসি, আমরা এসেছি তোমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাবার জন্য’। তাকিয়ে দেখি এই তুমুল বৃস্টি মাথায় করেও আরেক বয়স্ক দম্পতি রাস্তার উলটো দিকের বাড়িতে কথা বলছেন। কানাডাতে প্রায় বিশ বছর হতে চললো এমন ঘটনা তো দেখিনি! একেই কি গন জাগরন বলে?

এ ইলেকশনে ‘নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভংগ’ এ প্রবাদের এমন মোক্ষম প্রয়োগ দেখলো সব্বাই। নন-ইস্যুকে (নিকাব) জাতীয় ইস্যু বানিয়ে ক্ষমতাশীন কঞ্জারভেটিভ পার্টি এন ডি পি কে হারিয়েছেন, সেইসাথে নিজেরাও হেরেছেন। ভালোদিক হোল আম-জনতাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে গেছেন। দলে দলে মানুষ ভোট দিয়েছে, জনমত গড়েছে। স্বেচ্ছাশ্রমে এগিয়ে এসেছে বড়োবুড়ি, বৌ-ঝি, এমনকি হাই-স্কুলের স্টুডেন্টরাও। ভোটের দিন  সন্ধ্যা রাতে গড়ানোর আগেই লিবারেলের পালে হাওয়া লেগেছে, এবং রাত দশটায়ই কারো বুঝতে বাকি নেই জয়ের মালা কার গলায় যাবে। আমাদের কেন্দ্রে লিবারেল ক্যান্ডিডেট বিপূল ভোটে জিতেছেন। দিন দুই পর পথে নেমে দেখি গাছের রঙ্গিন পাতারা নেই, নেই মোড়ের সেই সব রং বেরঙের প্লাকার্ড, বদলে একটা বড় প্লাকার্ডে নিপীনবাসীকে হাসিমুখে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন বিজয়ী লিবারেল চন্দ্রা আরিয়া!! হাজার ব্যাস্ততা পাশ কাটিয়ে তিনি সশরীরে হাজির হয়েছেন এস এন এম সি তে মুসলিম ভোটারদের ধন্যবাদ দিতে, সাথে বিজয়ের আনন্দ ভাগ করে নিতে।


Photo Source

লিবারেল নেতা জাস্টিন ট্রুডো হয়েছেন প্রধান মন্ত্রী, এই প্রথম বারের মত দশজন অবর্জিনাল, ও দশজন  মুসলমান এম পি এসেছেন পার্লিয়ামেন্টে। চারজন শিখ হয়েছেন মন্ত্রী (প্রতিরক্ষা মন্ত্রী তাঁর শিখ ধর্মীয় প্রতীক পাগড়ী ও দাঁড়ি সহ শপথ নিলেন!),দুইজন প্রতিবন্ধি্‌, দুইজন অবর্জিনাল, পনেরজন মহিলা(একজন মুসলমান মহিলা, যিনি এদেশ এসেছিলেন রিফিউজি হিসেবে!) মোট একত্রিশ সদস্যর মন্ত্রীসভার শপথ অনুষ্ঠানের শেষে প্রধান মন্ত্রী সুন্দর করে বলেছেন ‘ A cabinet that  looks Like Canada’!!!

Facebook Comments