পরবাস – Porabas By Farzana Mowla

935

পরবাস

ফারজানা মাওলা অজন্তা

আমার আম্মার লেখা একটা বই আছে –একটাই বই লিখেছেন তিনি। বইটার নাম “পরবাসে একাত্তর”।

১৯৭১ –এর ভয়াল দিনগুলোতে আমরা যখন কাপ্তাই উপশহরের বাসিন্দা, জীবন বাঁচানোর তাগিদে আমাদের পরিবার তখন পালিয়ে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল ভারতের আগরতলায়। আমার বড়বোনের বয়স বছর তিনেক আর আমার কয়েক মাস – সেই সময় দুর্গম্য মেঘালয় পাহাড় পেরিয়ে, বিপদসঙ্কুল অচেনা পার্বত্য জনপদের মধ্য দিয়ে কখনও বন্ধুসুলভ আতিথেয়তা, কখনও শত্রুতার ফাঁদ এড়িয়ে প্রতিবেশি দেশটিতে পরাশ্রয়ে কাটানো কয়েকটি মাসের কাহিনী নিয়ে লেখা ছোট একটি বই।

বইটা লেখার সময়ে প্রুফ দেখার কাজে সাহায্য করেছিলাম। সেই একবারই আমি বইটা পড়তে পেরেছিলাম। আর কখনো আমি ওই বইটা পড়তে পারিনা। একান্ত আপনজনদের সেই কষ্টের গল্প দ্বিতীয় বার পড়বার সাহস পাইনি। আম্মা- নাতিবিংশতি, সদ্য সন্তান জন্মের পরে এই দুর্ভোগ। বার বার ভুগছেন মানসিক-শারিরীক দুরারোগ্য অসুখে। আমি কয়েক মাসের শিশু মৃতপ্রায় থেকে আবার জীবনে ফিরে আসা, তার পর টলমল পায়ে ভিনদেশের মাটিতে আস্তে, আস্তে হাঁটতে শিখে ‘নিজের পায়ে দাঁড়ানো – এভাবে একটা প্রায় ধ্বংসে যাওয়া সংসারের নতুন করে প্রথম থেকে ফিরে আসা।

অনেক কষ্টের বিজয় এল। আমরা নিজের দেশ পেলাম। আমার পরিবারের পরাশ্রয়ের কষ্ট শেষ হল। আব্বা-আম্মা-র ছোট্ট সংসারের প্রতিটি পার্থিব জিনিস তখন লুট হয়ে গেছে। আবার শুন্য থেকে শুরু করলেন নিজের দেশের মাটিতে – আবার গড়ে তুললেন সব।

যে গল্পের শেষটা বি্যোগান্তক নয়, সেই গল্পটাও আমি একবারের বেশী দুবার পড়তে পারিনা। জানি এই মুক্তিযুদ্ধে অনেক মানুষ যত হারিয়েছেন, আমার পরিবারের এই কষ্ট সে তুলনায় হয়তো অতি তুচ্ছ। তবু আপন মানুষদের কষ্টের কথা থেকে পালিয়েই থাকতে চাই।

আজকাল ইটারনেটে দেখা যায় যুদ্ধ-বিদ্ধস্ত দেশগুলোর কষ্টের ছবি। রক্ত, হানাহানি – আর সবচাইতে নির্মম হলো ছোট শিশুদের মৃত্যু। সমুদ্রতীরে পড়ে থাকা সিরিয়ান যে শিশুটির মৃতদেহের ছবি সারা পৃথিবীতে ঝড় তুলেছে – আমার মত অনেকেই নিশ্চয়ই দ্বিতীয় বার আর সেই ছবিটির

দিকে তাকাতে পারেন না। এখানেও আমরা পালিয়ে থাকতে চাই মানুষের অপরিসীম কষ্টের ছবি থেকে।

তাই যখন এই সব ভাগ্যাহত মানুষদের কিছু আশ্রয় নিয়ে আসতে শুরু করলেন আমদের দেশ ক্যানাডায় – আনন্দের সাথে একটা নিশ্চিন্ততার শ্বাস ফেলতে পারি। ভাবলে গর্ব হয় – আমার দেশ ক্যানাডা এই মহান পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেনি।আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী নিজে এয়ারপোর্টে গিয়ে বলেছেন, “Welcome home”।

পরবাসে যে সব খাওয়া-পরা-চিকিৎসার কষ্ট করেছিল আমার পরিবার – এই পরিবারগুলোর সেই কষ্টটুকু থাকবেনা। ক্যানাডিয়ান সরকার এবং জনগন তা নিয়ে প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

যুদ্ধ শেষে আমার পরিবার ফিরে যেতে পেরেছিল নিজের দেশে। এই পরিবার গুলোর জন্য অদূর ভবিষ্যতে সেরকম কোন সম্ভাবনা দেখা যায় না।

কিন্তু তারা পেয়েছে নতুন এক দেশ – যার অভিযোজিত নাগরিক আমরা সবাই আজ গর্বিত। এই দেশ মহান। পুরনো সব কষ্টের স্মৃতি ফেলে এই দেশকে আমরা সবাই মিলে নিয়ে যেতে পারবো ঔদার্য, মানবিকতা, সহমর্মিতা আর সম-অধিকারের এক দৃষ্টান্ত মূলক জাতি হিসাবে তুলে ধরতে।

যখন ইন্টারনেট এ দেখতে পাই হাস্যমুখ সিরিয়ান শিশু বসে আছে ক্যানাডিয়ান স্কুলের ক্লাসরুমে, বার-বার দেখতে চাই আর গর্বে মন ভরে ওঠে।

Facebook Comments