পরবাস প্রযন্ম – Third Culture by Asma Khan

552

’৭৮ সালে আমার স্বামী দেশ মহাদেশ পাড়ি দিয়ে বিলেতে গিয়েছিলেন তিনটি অক্ষর অর্জনের জন্য। University of Manchester Institute of Science and Technology (UMIST) এ । অক্ষর তিনটি হচ্ছে Ph. D, শুরুতে সব কিছুই কঠিন মনে হয়। তখন তাঁর কাছে বিষয়টি যেন হিমালয়ের দুর্গম দুর্জয় এভারেস্টের উচ্চতায় ছিল। হাইটেকের সেই সূচনা লগ্নে একেবারে নুতন টেকনোলজি ‘মাইক্রোকম্পিটার বেসড নেটওয়ার্ক’ এ তাঁর জ্ঞান নিতে হবে (তিন বছরের বৃত্তি), যার নামই সেই প্রথম শুনলেন। আমি আনাড়ি অনভিজ্ঞ মা, আমাদের যে শিশুটি দোলনায় দোল খাবার আগেই উড়াল দিয়েছিল, আজকে তাদের কথা, সেই পরবাস প্রযন্মের কথা চলুক।

শিশুরা দেখে শেখে, শুনে শেখে। বাসা আর আশেপাশে দেখে আর শুনে শুনেই বাংলার সাথে চমৎকার ইংলিশ, আর আমাদের উপর তলায় ছিল এক মালেয়েশিয়ান পরিবার,তাদের দুই মেয়ের কাছ থেকে ভালো ‘মালে’ ভাষা শিখে গিয়েছিল, যা আমরা মনে করেছিলাম অর্থহীন baby talk! তিন বছরে আমাদের দ্বিতীয় কন্যার জন্ম এবং আমার স্বামীর সেই তিন অক্ষর Ph. D অর্জনের পর ’৮১ সালে তিনি মধ্যপ্রাচ্যর ইউনিভার্সিটিতে যোগ দিয়েছিলেন।

আলিশান ক্যাম্পাসে ছিল আমাদের বাসা, বছরের দশ মাসের জন্য প্রতিবেশীরা শুধু সাদা বা আরব নয়, বরং এমন অনেক দেশের, যা শুধু ভূগোলে পড়েছি। ক্রমশঃ মেয়েরা বড় হোল, তারা যে স্কুলে গেল সেখানেও এমন যাদের সাথে তাদের বন্ধুত্ব হোল, ক্যাম্পাসের Expertriate পড়শির মত পৃথিবীর মানচিত্রে কোন এক অচেনা দেশের নাগরিক, যাদের সাথে প্রতি দিন ওঠাবসা, ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব। প্রতিবছরই চাকরির কন্ট্রাক্ট শেষে কেউ না কেউ চলে যেত, সেপ্টেম্বরে যারা ফিরে আসতো, এবং নুতন কেউ আসতো অজানা দেশের গল্প নিয়ে, যাত্রা পথের গল্প, অদেখা মানুষের গল্প, ও বন্ধুত্ব। একেবারে ছোট থেকেই তারা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল আধুনিক জিপসি সংস্কৃতিতে, আমজনতার কাছে এখনও এয়ারপোর্ট বড় কৌতুহলের, খানিকটা অচেনা। কিন্তু এ প্রযন্মের কাছে এয়ারপোর্ট ও প্লেনজার্নি যেন ঘরের চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে চেনা পথে নামা! তবে ক্যাম্পাস আর স্কুলের বাইরে সেদেশের সাথে মোটাদাগে আমাদের সামাজিক সাংস্কৃতিক আচরনে তেমন বিরোধ ছিল না।

প্রথমেই কবুল করে নেয়া ভালো, পুবের ঐ আরামের জীবন হারাম করে বাসার কেউ এদেশে আসতে চায়নি।  ’৯৬ সালে তিন টিন-এজ মেয়ে এবং নয় বছরের ছেলে নিয়ে ইমিগ্রান্ট হিসেবে অটোয়াতে এসেছিলাম। এসেই আমার স্বামী সিস্টেম আর্কিটেক্ট হিসেবে হাই-টেকে যোগ দিয়েছিলেন, তিনি আশে পাশের হাল হকিকত দেখে হাই টেক কোম্পানিকে বলতেন ‘চায়না ইন্ডিয়া কোম্পানি’ ( পুবের মানুষ সুন্দর পেচাই, সত্য নাদেলা, জন চ্যান উদাহরন)। ছেলে মেয়ের শিক্ষার জন্যই আসা।  কিন্তু স্কুল তো শুধু পাঠ্য বই এ সীমাবদ্ধ থাকে না, অলিখিত একটা সংস্কৃতিও থাকে। একটা বয়সে দিনের সেরা সময়টা কাটে তাদের স্কুলের বন্ধুদের সাথে, বাবা মায়ের ‘খবরদারি’ আর ‘বাসাবাড়ি’ এই বয়সে কোন মতেই ‘বেস্ট টাইম’ বা ‘বেস্ট প্লেস’ না।  প্রগতির এই দেশে মুক্ত সমাজের অবক্ষয় ‘Drink, Drug, Date এর ঝাপটা স্কুলেও  এসে লাগে।  মুল্যেবোধ রক্ষার জন্য এর বিপরীতে   Study, Sports, Spirituality  এর  বিকল্প দাওয়াই আর কিছু কি আছে?

বয়োঃসন্ধিঃ প্রত্যকের জীবনেই বড় জটিল সময়। বালিকা যখন রমণী এবং বালক যখন পুরুষ! একান্ত প্রাকৃতিক এই প্রক্রিয়া ব্যাক্তিগত পর্যায়ে কেমন ছাপ ফেলে? এ বড় নাজুক সময়। প্রতি মাসের মেয়েলি ঝামেলায় সাবধানতা ও অসাবধানের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে মেয়েদের সচেতন না করে কোন উপায় নেই। আর ছেলে তার ঢ্যাঙ্গা শরীর, ভরাট গলার স্বর, এখানে ওখানে আচমকা গজিয়ে ওঠা চুল, দাড়ি দৈহিক এই পরিবর্তনে নিজেই যখন বিব্রত, তখন আশেপাশে কাছের লোকজনের দৃস্টিই যেন বলে ‘বাবা বেশ তো লায়েক হয়ে গেছো, এখন কি খেল দেখাবে?’  ঐ দৃস্টির সামনে অজথাই তারা নিঃসঙ্গ হয়ে যায়, যখন ছেলেদের মানষলোকে স্বপ্ন , থেকে শুরু করে স্বপ্নদোষে আবেগের উথাল পাতাল হালত, অপরাধবোধ, গ্লানী, অথবা উচ্ছলিত আনন্দ, পুবের ইমিগ্রান্ট পরিবারে তখন সেটা বড় জটিল সময়। পারিবারীক মুল্যেবোধ বনাম প্রগতি, কেউ নিঃসঙ্গ হতে চায়না। সবাই চলমান সমাজে হতে চায় ফিট ইন। কিন্তু সে সমাজে সাধারনত নবাগত কিশোর হয় অযথা  Bully এর শিকার।

আসলে সামাজিক ব্যাকারন বড় সুক্ষ, জটিল এবং শর্তসাপেক্ষ। মোটাদাগে শর্তগুলো হচ্ছে; জাতী, ধর্ম, বর্ণ, ভাষার সংস্কৃতি। নিজের গরজেই মানুষ এক বা একাধিক শর্তসাপক্ষে নিজেদের সমাজ ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। আমার স্বামীর আবার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর বাতিক আছে। তিনি ’০২ সালে চাকরির পরে বিকেলের অবসরে  দুম করে স্বেচ্ছাশ্রমে MCSO নামে Non-Profit এক প্রতিষ্ঠান খুলে বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে প্রতিদিন হাই স্কুলের মুসলমান ছেলে পিলেদের ম্যাথ আর সাইন্স টিউটোরিং শুরু করলেন। টিউটররা  ইউনিভারসিটির ছাত্র ছাত্রী। আর উইক এন্ডে  পটলাক পার্টি এবং ধর্ম, ধর্মীয় সংস্কৃতি শেখানো। ক্রমশ  এ  পরবাসে সমাজকে ধরে রাখা, বিকশিত করার জন্য  SNMC এবং CBET নামে আরো দুটো চ্যারিটি অর্গানাজেশন খুললেন।

এখানে এসে দিশেহারা মায়েরা, ছেলে মেয়েদের উচ্ছন্নে যাবার ভয়ে এমন কষে হাত ধরেন, যেন তারা না পালায়, কিন্তু এতে ছেলে পিলের রোখ চেপে যায়, তার বদলে যদি চেনা জানা পরিবেশে ঝাঁকের কৈ মাছকে ঝাঁক বাঁধার সুযোগ দেয়া যায় সীমানা বেঁধে, তবে তাদের নিঃসঙ্গ বোধটা কেটে যায়, সমমনা বন্ধুদের সাথে পড়াশোনার সাথে সাথে মেলামেশার একটা সুযোগ তো দিতে হবে। যেটা এদেশে বলে Soft skill যার কদর বহুত, আর কে না জানে সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাস। তারুন্যর মানষলোকে যে বিশুদ্ধ আনন্দ, কৌতুহল, ভূল ভ্রান্তি, সফলতার উচ্ছল উদ্দীপনাকে সুসঙ্গহত, সুশৃংখল গন্তব্যর যাত্রাপথে অভিজ্ঞতায় আত্বপোলব্ধিই হচ্ছে তার জীবনবোধ। শিকড় দৃড় হলে গাছ ঝড় ঝাপটা সামলিয়ে বিকশিত হবেই। আজতক আমাদের প্রাজ্ঞ ইমাম সপ্তাহে একদিন Play, Prey, Pizza Party তে তাদের গাইড করছেন। কোচের খবরদারীতে মাঠে বল পায়ে নিয়ে যখন তীর বেগে গোল পোস্টে ছোটে, সাপের মত একেবেকে টীম মেম্বারের কাছে পাস দেয়, যে সমঝোতা, জয় পরাজয়ের হিসেব নিকেশ, একাত্বতা তাদের দক্ষতায় যেন স্ট্যাম্প মেরে দেয়। সময়ের সাথে সাথে গায়ে গতরে আপনা আপনি বড় হলেও জীবন বোধের জন্য কোচিং এবং গাইডেন্স যে বড্ড দরকার।

পরবাস প্রযন্মঃ শুরু থেকেই হোচট খায় ঘর এবং বাইরের জগতের সাথে সমন্ব্য় আর সেতু বন্ধনে। কৈশরের বিকশিত হবার সুচনায় স্কুলের পাঠ্য বইএর সাথে খেলাধুলা, স্বেচ্ছাশ্রম, পেইড পার্ট-টাইম চাকরির অভিজ্ঞতা, ড্রাইভিং লাইসেন্স, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সক্রিয় অংশ গ্রহণে তারা ক্রমেই ব্যালান্স করতে শেখে। সকালে দৌড়ে বাস ধরতে গিয়ে যে মেয়ে বরফে হোচট খেয়ে আহত অবস্থায় বাসে উঠে ইউনিভার্সিটি গিয়ে কপালের কাটা সেলাই করে ভাঙ্গা দাঁত নিয়েই পরীক্ষা দিয়ে সারাদিনের ক্লাস শেষে বাড়ি আসার পর নিজের কাঁটা ছেড়া চেহারা দেখে মায়ের কষ্ট পাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ‘আমরা এদেশে এসেছি লেখাপড়ার জন্য’। অথবা ষোলতম জন্মদিনে যে ছেলে স্কুল থেকেই সার্ভিস কানাডায় গিয়ে ড্রাইভিং এর Computer test দিয়ে সাথে সাথে আট মাস পরে Road test book করে ফেলে। বুক ধড়াস ফরাস করলেও টেস্টের দুই সপ্তাহ আগ থেকে  সকালে সবাই যখন বিছানায়, মা তখন প্রতিদিন ভোরে গাড়িতে ছেলের ড্রাইভিং প্রাক্টিসে নিয়ে গিয়েছে তার হাত পাকা করেছে, যাতে পয়লা টেস্টেই সফল হয় ছেলে। পরবাসে সব পরিবারের গল্পই পরের প্রযন্মের বিকাশের গল্প।। তারা ক্যারিয়ার সচেতন, শিকড় সচেতন, কিন্তু আশে পাশের দুনিয়ায় চোখ কান খোলা, ব্যালান্স করছে যেখানে যতটুকু দরকার।।

Facebook Comments