Immigrant Diary (When Time Stops) Asma Khan): ইমিগ্রান্ট কড়চা (সময় যখন থমকে থাকে…), আসমা খান

625

Immigrant Diary (When Time Stops) Asma Khan):  ইমিগ্রান্ট কড়চা (সময় যখন থমকে থাকে…), আসমা খান

Please visit my blog, http://asmakhan.cbet.ca/

অবশেষে অটোয়াতে শীত বিদায় নিল। আমার কাছে মনে হয়েছে এবারের শীত একটু অন্যরকম, সাকুল্যে কয়েকদিন মাত্র বরফ পড়েছে, কিন্তু ঐ ক’ দিন আকাশ যেন সফেদ সৌন্দর্য্য ঢেলে দিয়েছে অকৃপন ভাবে। ফলে ড্রাইভ ওয়ের দুপাশে রীতিমত সাদা বরফের পাহাড়, শুভ্র গিরিপথের (?)মধ্যে দিয়ে গাড়ি রাস্তায় নামানোর আগে দোয়া দরুদ পড়ে বের হয়েছি। মার্চেই লাগাতাই প্লাস টেম্পারেচার, তুমুল বৃস্টিতে আর বরফ গলে এবং মাটি যেহেতু এখনো ফ্রোজেন এখানে ওখানে ডোবা খাল বা পুকুরের মত হয়ে আছে। কি কান্ড!!! পাখ পাখালীও উড়ে এসে সেই সব পানিতে সাঁতার কাটছে।

রূপকথার মত শুভ্র অলৌকিক সুন্দর কানাডার শীতকালের ক্রুর খতরনাক দিক হচ্ছে এ সময়ের তীব্র শীত মানুষের দেহ মনে গিঠেগিঠে মরচে ধরিয়ে ছাড়ে। আর আমার মত যাদের বিশাল স্মৃতিময় ‘গতকাল’ আর বড় অনিশ্চিত ‘আগামীকাল’ তাদের জন্য কানাডিয়ান শীত বড় দুর্বিষহ। পশ্চিমের অতি আধুনিক এই  জিপসি কালচারে এমনিতেই ব্যাক্তির সক্ষমতা হরন করা ‘বার্ধক্য’ মানুষের আইডেন্টিটি হাইজ্যাক করে নেয়। আর ছেলেপিলে পড়াশোনা না হোলেও সংসার/ চাকরীর খাতিরে তো ঘর ছাড়ছেই। আমার এক পড়শি দুজনেই এই শীতে বড় খারাপ ধরনের ফ্লুতে বিছানা নিলেন। ছেলে মেয়ে চাকরী/সংসার উপলক্ষে একজন অটোয়ার সুদূর পশ্চিমে, আর একজন বহুদূরের দক্ষিনে। ইদানিং ইন্টারনেট হচ্ছে আলাদীনের জাদুর চেড়াগ! উনাদের ছেলেমেয়েরা সেই দুরত্বকে ঘুচিয়ে দিল ফোনেই topkapirestaurant.ca, তে খাবারের অর্ডার দিল হোম-ডেলিভারি দেয়ার জন্য। লোকে বলে ফ্লু ভালো হতে ঔষুধ খেলে লাগে সাতদিন আর ঔষুধ না খেলে লাগে এক সপ্তাহ! হায় রে আমাদের মায়ের হাতের জলপট্টি, হায় রে আমার শিং মাছ আর কাঁচাকলার ঝোল!

জীবনে কারোরই বার্ধক্য নিয়ে কোন স্বপ্ন বা ফ্যান্টাসি থাকেনা, অসুস্থতা নিয়েও না। এ যেন ক্রমশঃ অকর্মন্য হয়ে হারিয়ে যাওয়া, ফুরিয়ে যাওয়া, মিলিয়ে যাওয়া। এমনতো হবার কথা নয়, কিন্তু যখন হয়, তখন বড় দুর্বিষহ সময়। জীবনের মধ্য চল্লিশে যখন হটাৎ অকাল অসুস্থতার খপ্পরে পড়লাম, আমার শরীর আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলো,  আমার একান্ত পৃথিবীতে যেন ভুমিকম্প হোল, ধ্বস নামলো, মনোজগতের সেই বেহাল দশা, অপরিসীম কষ্ট যার জন্য আমি তৈরী ছিলামনা, তৈরী ছিলামনা মোটেও।  প্রবল ঝড়ের পর বিদ্ধস্ত বিরান অঞ্চলেও এক রকমের বিপন্ন বাস্তবতা থাকে, মানুষ তার ছেঁড়া খোঁড়া প্রিয়জনকে নিয়ে আবার মাথা গোঁজার,খাবার, দিন যাপনের কথা ভাবে। নিজ প্রয়োজনেই এমন একটা সমাজ ব্যাবস্থায় আমরা আছি, জীবন যাপনের জন্য রুজি রোজগার দরকার, জৈবিক প্রয়োজনে ঘর বাঁধা। পৃথিবীর যে কোন প্রান্তেই, কুড়েঘর বা আলিশান ইমারত যখন যেখানেই মানুষ জুটি বেধেঁছে, সম্পর্ককে লালন করতে হয়েছে মায়ার বাধঁনে, প্রযন্ম থেকে প্রযন্মে।

প্রথম প্রযন্ম ইমিগ্রান্ট, নিজ দেশের সেই এজমালি মায়ার বন্ধন ছেড়ে এই অচেনা দেশে এসে বসত করেছি, পাসপোর্ট নিয়েছি। কিন্তু আচানক অসুস্থ হওয়া মানে কি নিখাদ একাকিত্ব? পরিচিত মানুষের মনোভূমি থেকে, চেনা সামাজিকতা থেকে আড়াল হয়ে যাওয়া, কর্পুরের মত বাতাশে বিলীন হয়ে যাওয়া ?? অসুস্থতা মানে অবশ্যই কতক অক্ষমতা, নিজের সামান্য প্রয়োজনে অন্যর উপর নির্ভরতা যেকোন স্বাধীনচেতা মনে কি যে অপরাধবোধে ভাবায়! এদেশে ব্যাস্ত সবাই কারো সময় নেই, সময় নেই, কথা বলার, আশ্বাস দেবার। ফলে আমি কি অবয়ব হীন ফাটলে গড়িয়ে পড়লাম? ঐ অকাল বার্ধক্যে?

পশ্চিমে সমাজ ব্যাবস্থায় একটা কার্যকর ‘সিস্টেম’ জীবনযাত্রা সহজ করেছে। সেই ‘সিস্টেমে’ অটোয়াতে বাসে, ট্রেনে, চুল কাটাতে,ব্যাংকে, ড্রাগস্টোরে, মুভি-থিয়েটারে, কেনাকাটাতে সিনিওরদের বিশেষ মুল্যেছাড় দেয়া হয়। ফলে যদি হটাৎ কফি শপে, শপিংমলে, বাসে সদলে চমৎকার সাজগোজ করা সিনিওরদের দেখা যায় অবাক হবার কিছু নেই। এখানে আমাদের দেশের মত বার্ধক্য মানে বিবর্ন ধুসর নিঃসঙ্গ পরনির্ভর নয়, এখানে বার্ধক্য বড় উচ্চকিত, রঙ্গি্ন, দলবদ্ধ! থুত্থুরো বুড়িরাও দেখি এক্কেবারে টকটকে লাল লিপিস্টিক, নেলপালিশ দিয়ে চকমকে ড্রেস পড়ে ওয়াকার নিয়ে ঘুরতে বের হয়। অর্থাৎ জবড়জঙ্গ দেহের কারাগার থেকে মনটাকে মুক্ত করা! নিজেকে সৃজনশীল, কতক কর্মক্ষম রাখা, সামাজিক প্রেক্ষিতে!

’১১ সাল থেকে SNMC মাসে একদিন সিনিওর পোগ্রাম শুরু করে। কয়েকজন স্বেচ্ছাশ্রমে প্রতিমাসে এক সন্ধ্যায় তাদের জন্য আয়োজন করে একটি অনুষ্ঠান।  প্রাজ্ঞ ইমাম, নার্স, ডেন্টিস্ট, হাইজিনিস্ট, নিউট্রশনিস্ট, সাইকোলজিস্ট, ল্য’ইয়ার, অডিওলজিস্ট পালাক্রমে প্রতিমাসে মুল্যবান লেকচারে পেষাগত তথ্য দিয়ে এবং সবাই একসাথে ইয়োগা বা চেয়ারে বসে হালকা ব্যায়ামে, রেস্তরা থেকে আনা উপাদেয় খাবারে সিনিওরদের একটা সামাজিক ফোরাম তৈরী করলো। এবছরে সিনিওরদের নিয়ে দুটো ট্রিপ অর্গানাইজ করেছে। গত কয়েক মাস একটি পরিবার প্রতিমাসে একদিন নিজ খরচে, নিজেরা রান্না করে কম বেশি প্রায় জনা পঞ্চাশেক সিনিওরকে স্বেচ্ছাশ্রমে খাওয়াচ্ছেন। প্রথম যেদিন স্বামী স্ত্রী একসাথে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমাদের দুজনেরই বাবা মা গত হয়েছেন, তাঁদের স্মরনে আমরা মাসে একবার আপনাদের নিজহাতে খাওয়াতে চাই’। কে বলে জীবন ‘তাসের ঘর’, এভাবে অচেনাদের নিয়ে আপন জনের মত অনুভুতির দেয়ালে ‘মায়ার ঘর’ ও তো গড়া সম্ভব!!

এমাসে SNMC তে ফিউনারেল সার্ভিস শুরু হোল। অটোয়াতে পর পর দুজন মধ্য চল্লিশের ভদ্রলোক একজন ক্যান্সারে, অন্যজন হার্ট এটাকে মৃত্যুবরন করেছেন। স্বামীর লাসের পাশে যখন শোক-সন্তপ্ত অশ্রু ভেজা কাতর স্ত্রীকে দেখি, তখন মনে হয় ইমিগ্রান্ট স্ত্রীর জীবনে তো অনেক কিছুই হারাতে হয়, স্বামীকে হারানো বোধ হয় সবচেয়ে বড় বিসর্জন, যা তাকে একেবারে নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ করে ফেলে। জানাজার পর যখন কফিন নিয়ে চলে যাচ্ছে, আমার হুবুহু মনে নেই, একদম মনে নেই এটা কখন কোথায় শুনেছি বা পড়েছি…

‘খবর দিয়া আনবি মানুষ আমার জানাজাতে, লাসের পাশে

চারদিকে রাখবি নযর সে যেন দেখতে না আসে

সে যদি পায়রে খবর, ক্যামনে দিবি লাসের কবর

তোমাদের জাগিতে হবে যদি গো তার নয়ন ভাসে

ও আজ তার হৃদয় যেন পবিত্র মদিনারই মাটি

মৃত্যু বিছাইছে সেথায় জায়নামাজেরই পাটি…’

 Muslim Cemetery তে জানাজার পরে লাস দাফন করার জন্য নিয়ে যাওয়া হোল। যে কোন কবরস্থানের মধ্যে অসীমতা, আধ্যাত্বিকতা, বোধের অতীত বিশালত্ব আর সব হারানোর হাহাকার জড়িয়ে থাকে। কান্নাভেজা মৃত্যুগন্ধী মাটিতে খোঁড়া কবরে কফিনে প্রিয় স্বামীকে মাটিচাপা দেয়া হয়েছে। ‘মাটি থেকে তৈরী, মাটিতেই প্রত্যাবর্তন!’ পিতৃহারা ছোট ছেলে মেয়ে কচি হাত তুলে দোয়া করলো ‘হে আল্লাহ আমার বাবাকে তুমি দেখে রাখো, যেমন করে তিনি আমাদের ছোট বেলায় দেখে রেখেছিলেন!’

এতিম সন্তানদের নিয়ে এই অকালে বিধবা স্বামীর স্মৃতি, শোকে যা পাহাড়ের চেয়ে ভারী, সমুদ্রের চেয়েও উত্তাল বিশাল, তা তিনি একা একা নিরবে বহন করবেন। এই শোক-সন্তপ্ততাই কি এ জীবনে ভালোবাসার মুল্যে ???

* প্রথমে স্বেচ্ছাশ্রমে শুরু হলেও এখন SNMC তে একজন চমৎকার সিনিওর কো-অর্ডিনোটর আছেন, যিনি সিনিওরদের এই সামাজিক প্লাটফর্মে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

** মৃত্যু সংবাদ ই-মেইলে (৫০০০ সদস্য) সবাইকে জানানো হয়। SNMC ফিউনারেল সার্ভিস স্বেচ্ছাশ্রমে হাস্পাতাল থেকে লাস এনে শেষ গোসল, কাফন, কফিন, জানাজা এবং কবরস্থান পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হয়। এবং ঐ দিন মৃতের পরিবারের খাবারের ব্যাবস্থা করে। মৃত্যুর পর সামাজিক শোক প্রকাশের জন্য  SNMC তে একদিনের কয়েক ঘন্টা ফ্রি বুকিং দেয়া হয়।

*** ‘০৪ সালে আমরা যখন অটোয়া মুসলিম কবরস্থানের কথা শুনে দেখতে গিয়েছিলাম, তখন ছিল একদম ঘোর জঙ্গল, আজ Ottawa Muslim Cemetery এখানে দেখুন!

Facebook Comments