Immigrant Diary (Forest Fire, Colored Flower), ইমিগ্রান্ট কড়চা, (বুনো আগুন, রঙ্গিন ফুল) আসমা খান

712
FORT MCMURRAY, AB - MAY 06: The foundation of a home smolders in a residential neighborhood destroyed by a wildfire on May 6, 2016 in Fort McMurray, Alberta, Canada Wildfires, which are still burning out of control, have forced the evacuation of more than 80,000 residents from the town. (Photo by Scott Olson/Getty Images)

ইমিগ্রান্ট কড়চা, (বুনো আগুন, রঙ্গিন ফুল) আসমা খান

স্কুলবেলায় চমৎকার একটা গল্পের বই পড়েছিলামনিশিকুটুম্ব’! সেই সব সিঁধকাটা চোরদের কাহিনী আম্মাকে বই থেকে পড়ে পড়ে শোনাতাম। আম্মা শুনেটুনে বলতেনআরে সিঁধকেটে চোর আর কতটা নেয়? ভাগ্য ভালো হলে জীবন বাঁচলেও বাড়িতে আগুন লাগলে আগুন মানুষকে তো পথে বসিয়ে দেয় আগুনকে সবাই ভয় পায়কারন আগুন সর্বগ্রাসী, ধ্বংসের প্রলয়ঙ্করী ক্ষমতার সামনে মানুষ বড় অসহায়। শিশু, বৃদ্ধ, রুগ্নদের নিরাপদে রেখে বাকি জনপদ শ্ত্রু, মিত্র, নারী, পুরুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আগুনের সাথে যুদ্ধ করে। ধ্বংসের মুর্তিমান প্রতীক আগুনকে ব্যানার হিসেবে বাতাস উড়িয়ে নিয়ে চলে পোড়াবার জন্য, বাছ বিচারহীন এই অপ্রতিরোধ্য দাহ্য শক্তির সাথে আল্লাহর রহমত, কৌশল, সাহসের সাথে উপদ্রুত অঞ্চলে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করা ফায়ার ফাইটারদের তাই বীরের মর্যদা দেয়া হয়।

Fort McMurray fire এ  কানাডা্র নিজভুমেই বিশাল এক জনপদ যখন  ছিন্নমূল, উদবাস্তু, পরবাসী।  ঘর বাড়ি, নিজের পরিচয় বলে যা কিছু একান্ত আপন নিজস্ব, চোখের পলকে পুড়ে যাওয়া, সব হারিরে যাওয়া, মিলিয়ে যাওয়া, একেবারে ছাই হয়ে, নেই হয়ে যাওয়া।  ধ্বংশের এই সর্ব্ব্যাপী আগ্রাসী চেহারা চরিত্র মানুষ যেন নিজেই নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করে, এই যে আমাদের নাম, ঠিকানা, অস্তিত্বের, সঞ্চয়ের নিজস্ব মালিকানা, এই যে পাড়ায় পাড়ায় সামাজিক ব্যাকারনে ধনে, জ্ঞানে, বংশের নানান কূটকৌশলে সম্পদের বা মর্যদার যে অদৃশ্য বিভাজন, যে বাউন্ডারী যে কোন জনপদে আমজনতা যা মেনে চলে বা চলতে বাধ্য হয়, ফরেস্ট ফায়ারের মত দুর্যোগ সে বাউন্ডারী বা বিভাজন গুড়িয়ে দেয়, এক কাতারে সব্বাইকে অসহায় মানুষ হিসেবে দাঁড় করায়।  Fort McMurray এখন শুধুই ধ্বংশের অবশেষ। সীমানাহীন অগ্নিদগ্ধ বিদ্ধস্ত জন মানবহীন বিরান অঞ্চল, বাতাশে দম আটকানো পোড়া গন্ধ।

প্রায় ৯৪০০০ মানুষ হয়েছে সর্বহারা, ভিটেছাড়া। উপদ্রুত অঞ্চল থেকে কতৃপক্ষ চমৎকার দক্ষতার সাথে এই বিশাল জনগোষ্ঠিকে নিরাপদে স্থানান্তর, তাদের হদিশ রাখা, বিপদসীমাকে পাস কাটিয়ে গাইড করে নিরাপদে আশ্রয়কেন্দ্রে পৌছে দেয়া অবশ্যই প্রশংসার দাবী রাখে। কানাডিয়ান ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে উদবাস্তুদের পাশে দাড়িয়েছে।   সব ছিন্নমূল মানুষের জন্য অটোয়াতে  UMO-OG (ইউনাইটড মুসলিম অর্গানাজেশনসঅটোয়া গ্যাটিনো) এবং  CBET  চৌষট্টি হাজার ডলার Red cross কে দান করেছে। দানকে উৎসাহিত করার জন্য সরকারী ঘোষনা আমজনতার দানের সমপরিমান অর্থ সরকারও দান করবেন। Red Cross এর মত SNMC বা CBET এর  অনলাইন ফর্মে সহজেই জাকাত ছাদাকা দেয়ার এটা একটা ভালো সুযোগ। SNMC তে জুম্মার নামাজের পরেইইস্তিসকা নামাজে আল্লাহর কাছে  আকূল হয়ে বৃস্টির জন্য দোয়া করলেন আগুনকে নিস্তেজ করার জন্য।

জীবনের কঠিনতম সময় মনে হয় যখন একান্ত আপন জনের মৃত্যু সংবাদ আসে। তেরই মে আমার শ্বাশুরী পরলোকে চলে গেলেন। ‘ইন্না লিল্লাহি… … রাজেউন’।

মা      

টেলিফোনেই হটাৎ করে মায়ের খবর এলো,

মনের মাঝে আর্তনাদে বেদনা চমকালো।

কাজেভরা এই প্রবাসে, ক্ষীন হওয়া মমতার সেই টান।

গ্লানীভরা দুঃখী মনে শোনায় আজি নোঙর ছেঁড়ার গান।

অনাথ হওয়া শুন্য মনে স্নৃতির আনাগোনা।

ছোট বড় সকল স্নৃতিই আজ অনেক দামী সোনা।

মাগো, জীবন তোমার কেটেই গেল,ভোগান্তিরই দেশে,

ছেলে মেয়ে করলে মানুষ গভীর ভালোবেসে,

সকাল সাঁঝে কাজের মাঝে,নযর সবার পরে,

ধৈর্য্য দিয়ে, ত্যাগ দিয়ে, শান্তি আনতে ঘরে।

হৃদয় ঘড়ি থামার পরে, তোমায় শুইয়ে দিল ঐ কবরে,

বিছিয়ে দিল ঘাস,

জীবন লীলা সাঙ্গ করে, মিলিয়ে গেলে কোন আঁধারে

মাগো, তুমি এখন স্মৃতির ইতিহাস।

 জন্মও একা, মৃত্যুও একা, সবার সাথেই জীবন কর্মফল,

সমাজেরই বন্ধু স্বজন, করবে স্বরন, আজ ফেলবে চোখের জল।

মাগো, তোমার দোয়াই আমার লক্ষ্য ছোয়ার রক্ষা কবজ হবে,

তুমি আমার প্রতিক্ষনের, চেতন মনের অনুভবে রবে।।

মে মাস হচ্ছে ফুলের মাস। চারদিক শুধু রং বেরঙের ফুল আর ফুল। ১২ তারিখ থেকে তেইশ তারিখ পর্যন্ত হচ্ছে টিউলিপ ফেস্টিভ্যাল। কত রঙের যে টিউলিপ!! যেকোন রাস্তায় যাবার পথপাশেই এখন ড্যান্ডিলিয়ন বাংলাদেশের সর্ষে ফুলের মত এক অলৌকিক সৌন্দর্য্যের জন্ম দিচ্ছে, মোহ জাগানিয়া,  নিখুঁত চিত্রশিল্পের মত। কানাডাতে এসে একদম শুরু থেকেই আমি বাগান করছি।  বাড়ির সামনে লাগাই ফুল, আর পিছনে লাগাই দেশী সবজি। যদিও অটোয়াতে দেশী সবজির আকাল ঘুচেছে বেশ বছর। সব সুপারমার্কেটেই এখন আমাদের দেশী করলা, লাউ, ঢেড়শ, বেগুন, মুখিকচু, মুলো, কাঁচকলা, ধনেপাতা কাঁচামরিচ সব সবকিছুই সুলভে পাওয়া যায়।  তবু নিজ হাতে বাগান করা বাগান থেকে হারভেস্ট করার আনন্দ অসাধরন।

বছর কোন কোন ফুল, সবজি লাগাবো?

পিউনি, কয়েক ধরনের গোলাপ হাইড্রেঞ্জার সাথে মনে যেটা ধরে।  কানাডাতে এসে শুরুতে কাঁচামরিচ, দেশী সবজির তীব্র অভাব ছিল, তাই নিজের গরজেই বাগান করা শুরু করেছিলাম, রসনাকে তৃপ্ত করার জন্য, স্মৃতিটাকে ধরে রাখার জন্য, নিজস্ব পরিচয় ফুটিয়ে তুলেছিলাম আঙ্গিনাতে, পুঁই আর লাউ কুমড়োর মাঁচায়। পিকেলিং শষার ফলন দেখেছেন? পাতায় পাতায় শষা, এবং একটু ধৈর্য্য ধরলে তা বেশ বড়সরও হয়, রান্না করেও খাওয়া যায়। সীম, বরবটি প্রচুর ফলে, এবং খুব একটা যত্ন ছাড়াই টমেটো গাছ ঝুড়ি ভরা কাঁচা পাকা টমেটো উপহার দেবে। ইতিমধ্যে বাটারনাট, বাটারকাপ, স্পেগেটি স্কোয়াসের বিচি লাগিয়েছি। সীম বরবটির বিচিও। লাউ, পুঁই, টমেটো, বেগুন, কাঁচামরিচের চারা এখনো ঘরেই উষ্ণ দিনের অপেক্ষায়। জমি তৈরী, ডাটা, লালশাক, মুলাশাক, ধনেপাতার জন্য।

চৌকাঠ ডিঙ্গিয়েই সবজি বাগান, আমার আপন ভুবনে বিস্মিত হবার মত কত সম্ভাবনা যে লুকিয়ে থাকে! প্রতিদিন মুগ্ধ হয়ে দেখি!!!

Facebook Comments