ইমিগ্রান্ট কড়চা (অটোয়াতে রোজা), আসমা খান Immigrant Diary (Fasting in Ottawa) Asma Khan

722

 

ইমিগ্রান্ট কড়চা (অটোয়াতে রোজা), আসমা খান

’১৬ সালের জুন মাসে অটোয়াতে রোজা !!

শীতপ্রধান এই দেশে ক্ষনিকের এই উষ্ণতায় প্রকৃতি ফুলে ফলে সাজে নিটোল ,মোহন সাজে। এখানে মানুষও,বড় খোলামেলা, বড় উচ্ছলতায় নিজেকে সাজায়, বড় অবহেলায় এবং অবলীলায় পরস্পরের দেহ মন নাড়া চাড়া করে,সম্পর্কের বন্ধকীর পরোয়া না করেই।  স্বাধীন, অর্থে,  বিত্ত্বে, খাদ্যের প্রাচুর্য্যের এই দেশে দেহ মনের লাগাম টানা, কৃচ্ছতা???

লাখ লাখ মুসলমান সারাবিশ্বে মাসব্যাপী রোজা শুরু করেছেন। অটোয়াতে প্রায় আঠেরো ঘণ্টার রোজা,  নির্জ্বলা উপোষ, খাবার না পানি না, স্টারবাকের চা, কফি না, না, চকলেট ও না, ডেয়ারী কুইনের আইসক্রিম, স্মুদি তো না ই। শুধু কি তাই ? মানুষের কি শুধু খাবারের খিধে থাকে? চোখের ,কানের, বলার বা শোনার (রসালো গছিপ), স্পর্শের ইচ্ছের, আবেগের, রাগ অভিমানের, অহংকারের, ক্ষমতার মোহের সংযমও  কিন্তু রোজার শর্ত। এমনিতেই গায়ের রং, পোষাক, আর ধর্মের জন্য আমরা এদেশে সংখ্যালঘূ, তাই রমজান মাসে রোজা রেখে পাব্লিক প্লেসে যাওয়া কিন্তু একান্ত ব্যাক্তিগত উপাষনা থাকে না, রোজাদার হয়ে যান সংযমের ও শিষ্টাচারের উজ্জ্বল উদাহরন। রিচুয়াল হিসেবে আরো রয়েছে রাত জেগে তারাবীর নামাজে পবিত্র কোরান তেলায়োত করা। নিজের ও সকলের জন্য মৃত, জীবিত, আত্বীয়,অনাত্বীয় সব্বার জন্য দোয়া করা। যাকাত দিয়ে নিজ সঞ্চয়কে পরিশুদ্ধ ও প্রবৃদ্ধি করা। গরিবের জন্য ফেতরা দেয়া। অর্থাৎ আমাদের  জীবনবোধে রমজান মাস বাইসাইকেলের ছোট্ট ছোট্ট ট্রেনিং হুইলের মত জীবনের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তীর মধ্যে ব্যালান্স করে আমাদের আচরনকে পরিশীলিত করে ভালো মানুষে উত্তরণ হওয়া !!

৫৭০ খৃস্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশে মুহাম্মদ (দঃ) নামে যে শিশুটি জন্ম গ্রহন করেছিলেন, জন্মের আগেই বাবাকে,  শৈশবেই মাকে এবং দাদাকে হারিয়ে চাচা আবুতালিবের মেষ খামারের দেখভাল করেই বড় হয়েছিলেন। নিরক্ষর, এতিম, কিন্তু তাঁর শিষ্টাচারের জন্য ছিলেন বিখ্যাত, সেই অন্ধকার সমাজেও  ‘আল-আমীন’ উপাধি পেয়েছিলেন। নবুয়ত পাওয়ার পর আমাদের শেষ নবী যে জীবন বিধান দিয়ে গিয়েছেন, সারা বিশ্বের মুসলমানেরা আজতক সেটা মেনে চলছে। সেই সময়ে মক্কার ধু ধু মরুভূমিতে এমন এক ধর্মের পরশ পাথর দিয়ে গেছেন, যার পরশে তৎকালীন অশিক্ষিত, রুখু, মেজাজী, কলহ প্রিয়, গোত্রভুক্ত আরবদের মনে এমন এক ধর্মীয় বিশ্বাসের আলো জ্বালিয়েছেন যা সে সময়ে তাদেরকে বদলে দিয়েছিলো আমূলে।  নাঙ্গা তলোয়ার হাতে যে  ওমর (রা) গিয়েছিলেন নবীজিকে খুন করতে, সেই তিনিই ধর্মান্তরিত হবার পরে সামাজিক ন্যায় বিচারের উজ্জ্বল উদাহরন হিসেবে হয়েছেন ইতিহাসে অনতিক্রম্য।  এশিয়া, আফ্রিকার বিশাল ভূখন্ডে ইসলাম ছড়িয়েছে সময়ের সাথে সাথে।

প্রায় চৌদ্দ ‘শ সাল  ধরে বিশাল দুই মহাদেশ এশিয়া এবং আফ্রিকার বিভিন্ন জাতীর দ্যুতিময় স্থানীয় সংস্কৃতি ঐ ধর্মীয় ফিল্টারে পরিশীলিত ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে একবিংশ শতকে পশ্চিমের ইউরোপ এবং আমেরিকা/কানাডায়  মুসলমানেরা ইমিগ্রান্ট হিসেবে বসত করা অপরিসীম এক পরিচয় শুন্যতায় পড়লেন। এই শতকের গোড়াতেই  কতিপয় হটকারী  (৯/১১) হাইজ্যাকার পশ্চিমের জন সাধারনের কাছে তাবৎ মুসলমানদের ইমেজকে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।  আসলে স্রস্টাকে মেনে মানুষের প্রবৃতিকে, অহংকারকে, লোভকে, ক্রোধকে বা যাবতীয় নেগেটিভ চিন্তা আচরনকে বদলে ফেলার উপদেশ দেবার কারনেই কিন্তু নবী রসুল বা সংস্কারক নেতাদের সমকালীন সমাজে লাঞ্চনার স্বীকার হতে হয়েছে। ঈশা আঃ কে ক্রসে তোলার রায় দিয়েছে সেই সময়। মুহাম্মদ দঃ কে মক্কা থেকে মদীনাতে হিজরত করতে হয়েছে কেন?

শান্তি ভোজ

রমজানে আমরা বরং অতি আধুনিক এই স্থানীয় অটোয়ার কথা বলি। SNMC  তে মসজিদেরই দেয়ালের সাথে বিশাল বিশাল দরজা দিয়ে লাগোয়া কমিউনিটি হলে  প্রতিদিন গড়ে চার ‘শ লোক ইফতার এবং ডিনার (রেস্টুরেন্ট থেকে ক্যাটারিং করা) সপরিবারে এসে  দেশী ভিনদেশিদের সঙ্গ উপভোগ করেছেন।  প্রথমে শুধুই খেজুর আর পানি দিয়ে রোজা ভেঙ্গে জামাতে মাগরীবের নামাজের পর সুশৃংখল লাইনে দাড়িয়ে খাবারের প্যাকেট সংগ্রহ করে সবান্ধব বসে ডিনার খাচ্ছেন।

২৫ শে জুন হতে চলেছে ‘শান্তি ভোজ’ (Peace Dinner) snmc newsletter। একজন মুসলমান পরিবার তার প্রতিবেশি, বা কর্মস্থলের সহকর্মি সে যে কোন ধর্মের, যে কোন বর্ণের হোক না কেন নিয়ে আসবেন ইফতারে, একসাথে একই টেবিলে সবাই ইফতার ও ডিনার খাবেন।

১৫ ই জুন এই প্রথম অটোয়ার পার্লিয়ামেন্ট হিলে কানাডার গন্যমান্য প্রায় ছয় ‘শ মুসলমান নাগরিকেদের মোট মাননীয় বিশ জন এম পি স্পন্সর করে ইফতারের আয়োজন করেন। সেখানে পাঁচ জন স্বনামধন্য মন্ত্রিও উপস্থিত ছিলেন। ফরেন মিনিস্টার এত চমৎকার বক্তব্য বিশ্ব জোড়া নৈরাজ্যর মধ্য যেন আশার আলো বিকিরন করলেন!!!

২৬শে জুন হচ্ছে   SNMC  তে ‘সিরিয়ান রিফিউজি স্পন্সর ডিনার’ (Syrian Refugee Sponsors’ Dinner)। যে সমস্ত কানাডিয়ান ব্যাক্তিগত পর্যায়ে সিরিয়ান রিফিউজিদের স্পন্সর করেছেন, তাঁরা এবং রিফিউজি পরিবারদের জন্য দেয়া হচ্ছে এ দিনের ইফতার এবং ডিনার।

SNMC তে শুধু নামাজে ও হালাকার আধ্যাতিক কেন্দ্র নয়, ( জুম্মা, তারাবীতে গড়ে প্রায় হাজার খানেক মানুষ নামাজ পড়েন। ১০ + বিভিন্ন আধ্যাত্বিক পোগ্রাম সপ্তাহ ভর চলছে,) সামাজিক যোগাযোগ কেন্দ্র ও বটে, যে কেন্দ্র সকলকে আপন করে নেয় সমান ভাবে।

এই কমিনিটি হলেই  ১৮ই জুন হচ্ছে ঈদ বাজার, এবং কমিউনিট পটলাক ইফতার পার্টি। ঐ দিন ইমিগ্রান্ট পরিবার সচ্ছন্দে স্মৃতির ঘুড়ি উড়াতে পারবেন, পাবেন দেশী খাবার,পোষাক, লাটাইএর সুতো ছাড়লে পেতে পারেন হারানো শৈশবের দুর্ল্ভ স্মৃতি,  নিজ নিজ দেশের উৎসবের পোষাকে বা, জুয়েলারী বা  খেলনায়,  বিকি কিনি হচ্ছে, খাবার,দাবারও  সব ভাষাভাষী দেশী ভিন দেশী যখন এক টেবিলে বসেন, জীবনের অনুভুতিগুলিকে পাশের জনের সাথে শেয়ার করে নেন, আফ্রিকার লিবিয়ার হোন অথবা এশিয়ার ইন্ডিয়ার হন অর্থাৎ যে কোন দেশী বা ভাষার হোন না কেন তিনি  তখন একটা সাধারন যোগাযোগ ক্ষেত্র তৈরী হয়, ইমিগ্রান্ট জীবনের হাহাকার, ক্ষত, শুন্যতা, নিরাময় হয় ধীরে ধীরে, মন জীবন মুখী হয় অনেক বেশী,পরস্পরের সমব্যাথী হয়ে উপলব্ধি করতে পারেন সকলেই আসলে ‘কানাডিয়ান মুসলিম নাগরিক’!!!  এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়ার সাথে সাথে প্রাত্যহিক জীবনেও এক পাতায় এসে দাড়ান। মহানবীর দঃ বিদায় হজ্জ্বের শেষ ভাষনের কথা মনে আছে?

SNMC Belongs to YOU, ME, AND US!!!

 

Facebook Comments