ইমিগ্রান্ট কড়চা (ঈদ মোবারক), আসমা খান Immigrant Diary (Eid Mubarak) Asma Khan

635

ইমিগ্রান্ট কড়চা (ঈদ মোবারক), আসমা খান

একেবারে ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি আমাদের চেনাজানা লোকজনের আয়-ব্যায়ের ফর্দ অর্থাৎ বাৎসরিক পারিবারিক বাজেট হোত রমজান এবং ঈদকে কেন্দ্র করে।  সমাজ ব্যাবস্থার বিবর্তনে সেই প্রাচিন যুগের কড়ি, মধ্য যুগের মোহর, আধুনিক যুগের কাগুজে টাকা, আর ইদানিংকার প্লাস্টিক ডেবিট, ক্রেডিট কার্ড  আয়-ব্যায় বা লেনদেনের ধরন/মাধ্যম বদলালেও মানুষের মুল উদ্দেশ্যেতো একইঃ একটু ভালো থাকা, সচ্চলতার মুখ দেখা। পালা পার্বনে আপনজনের উপহার দেয়া নেয়া, একটু ভালো খাওয়া পড়ার খরচা করা এই তো? সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসব মানে হচ্ছে সংযত আনন্দের সংকলন ! দুঁদে ব্যাবসায়ীরা এ উপলক্ষে  পোষাক, খাবার, অলংকার, খেলনা বলা যেতে পারে মানব মনের চিরন্তন আকাঙ্খা গুলি এক একটি পন্য হিসেবে বাজার জাত করে চুটিয়ে ব্যাবসা করেন। বিশ বছর আগে যখন অটোয়াতে আসি তখন ভাবতেও পারিনি, ইস্টার  বা খ্রীস্টমাসের মত রমজান বা ঈদের বিভিন্ন হালাল পন্যর মূল্যেছাড়ের বিজ্ঞাপনও দেখবো টিভিতে বা মুল্ধারার বিশাল বিশাল দোকানের  ঈদ  ফ্লায়ার  গুলো পাবো নিজেদের  মেইলবক্সে!!

ঈদের দিনে স্ব ঐতিহ্যর বিশেষ সাজ সজ্জা লাগে বৈ কি! এই একটি দিনে অন্তত শিকড়ে ফিরে যায় মন। আর যা চমৎকার সাজ পোষাক এ উপলক্ষে বাজারজাত হয়!! বিভিন্ন এথেনিক বুটিক ছাড়াও অনেক পরিশ্রমী উদ্যক্তা বাড়িতে বা কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে ঈদ বাজারের আয়োজন করেন। যারা দেশে যান তারা নিজেদের পছন্দের পোষাক সঙ্গেই নিয়ে আসেন। সাউথ এশিয়ান তরুন প্রযন্মের পছন্দ দেখা যাচ্ছে বাহারী কাজ করা সালোয়ার, কামিজ, আর ছেলেদের নজর কাড়া পাঞ্জাবী।

জীবন আসলে স্থান এবং সময় নির্ভর। আগে ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে যে সংশয় বা অনিশ্চিত অপেক্ষা থাকতো, এখন আর তা নেই। আকাশে ওঠার আগেই ইন্টারনেটে চাঁদ উঠে যায়, ভরদুপুরেই জানা হয়ে যায় চাঁদের খবর। উইক-ডে তে ঈদ হলে অনেকে ইচ্ছে হলেও অফিস থেকে ছুটি নিতে পারেন না। ভাগ্যিস অনেক চেস্টায় গত তিন বছর অটোয়াতে রোজার শুরু এবং ঈদ একই দিনে হচ্ছে!!! রোজা মানে শুধু নিজে অভুক্ত থাকা নয়, অদৃশ্য স্রষ্টাকে প্রতিনিয়ত স্মরণ করে প্রতিদিনের যাপিত জীবনে আরো বেশী মানবিক হওয়া। SNMC  Peace Dinner এ আসা এক বিদেশিনী  প্রশ্ন করে, ‘দুর্বল, অসুস্থ, বৃদ্ধদেরও কি এই আঠেরো ঘনটার রোজা রাখতেই হবে?’ উত্তরে সে যখন শোনে রোজা শুধু প্রাপ্ত বয়স্ক, সুস্থ ব্যাক্তির জন্য। অসুস্থ, বৃদ্ধব্যাক্তি রোজা না রাখতে পারলে ‘ফিদিয়া’ অর্থাৎ একজন দরিদ্রেকে প্রতি রোজার জন্য তিনবেলা খাবার বা খাবার কেনার জন্য টাকা দিতে হবে। খুব খুশি হয়ে বিদেশিনী  মন্তব্য করেন, ‘ব্যাপারটা খুবই মানবিক তো!’

ঘরছাড়া ছেলেমেয়ে ছুটি নিয়ে  ঘরে ফেরে। স্পেশাল ইফতার,হৈ চৈ করে ভুজিয়া গুলি সাবার করা, ভাই বোনে কে কতটা পিঁয়াজি বেগুনি খেলো, পিয়াজি, বেগুনি, আলুর চপ, যত স্বাস্থ্য সচেতনই হোক না কেন সবার সাথে বসলে আনন্দের ধরনই আলাদা।

এক মাস সংযমের রোজার পর ঈদ হয় উৎসবমুখর বেশ বর্নাধ্য।   চেনা অচেনা পাঁচমিশেলি সমাজে এশিয়া, আফ্রিকার মুসলমানদের ঐতিহ্যের সাজ পোষাকে সপরিবারে এক কাতারে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ, মনোযোগে খোতবা শোনা, সকলের সাথে সখ্যতা কোলাকুলি হাসিমুখে ‘ঈদ মোবারক’ শুভেচ্ছা বিনিময়।  গত এক দশকে অটোয়াতে মুসলমানের সংখ্যা বেড়েছে অনেক অনেক গুন প্রায় এক থেকে সোয়া লাখ। শহরের বিভিন্ন মসজিদে, বিভিন্ন কমিউনিটি সেন্টারে দফায় দফায় ঈদের জামাত হয়েছে।

এখানে উল্লেখযোগ্য এয়ারপোর্টের কাছে বিশাল EY Centre ই ওয়াই সেন্টার। সারাদিনমান ধরে ঈদ উদযাপন!!! নামাজের পরে বিভিন্ন ফেস্টিভ খাবারের অস্থায়ী দোকান, আড্ডা দেবার ভালো জায়গা, বাচ্চাদের দাপিয়ে খেলার চমৎকার আয়োজন, কাপর চোপর, গয়নাগাটি, পারফিউমের বা শোখিন টুকিটাকি, বাচ্চাদের খেলনার বাজার!!! বিশাল পার্কিং লট, পুলিশ মামাদের টিকেটের ভয় নেই। গতবছর হোল কি আমার বাসার সামনের রাস্তায় গাড়ি পার্ক করে বড় কন্যা ঘরেই বসা, বেড়াতে আসা গেস্ট ঘরে ঢুকে তাকে বলে ‘দৌড়াও ট্রাফিক পুলিশ ঈদি নিতে আসছে!’ হায় !হায় !!  বলা নেই , কওয়া নেই , পচাত্তর ডলারের পার্কিং টিকেট!!! সেই প্রথম জানলাম তিন ঘন্টার বেশী রাস্তার পাশে পার্ক করে রাখলে ট্রাফিক মামা মনে চাইলে পার্কিং টিকেট দিতে পারেন!

ঈদের দিন সকালে বাড়িতে বাথ্রুম নিয়ে, ইস্ত্রি নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে যায়। সাড়ে সাতটার জামাত। খালিমুখে যাতে কেউ ঘর না ছাড়ে, আগের রাতেই  টেবিলে নারকেলের পিঠা, সিঙ্গারা, সেমাই রেডি করে রেখেছি। মর্জিমাফিক ন্যাপকিনে যার যার পছন্দের স্ন্যাক নিয়ে হুরমুর করে গাড়িতে উঠে সবাই প্রথম জামাতই ধরেছে। সকাল সোয়া সাতটায় মসজিদে গিয়ে দেখি তিল ধারনের জায়গা নেই। আমি মসজিদের বারান্দায় চেয়ারে বসে নামাজ পড়লাম। বাসায় এসে আমার তিন বছরের নাতনি আমার কাছে এসে বলে ‘নানু আই ওয়ান্ট টু ইট পিঠা’। শুধু নাতনি না তার নানা, খালা, খালু সমানে পিঠার খোঁজেই ছিল!!!

হালাল খাবারের আকাল বেশ আগেই ঘুচেছে অটোয়াতে। ঈদের দিন ওপেন হাউজ করেন অনেকেই। নামাজের পর সারা দিন পাড়ায় পাড়ায় জম্পেশ আড্ডা হয় ঐ সব ওপেন হাউজে। দুই বা তিন ঘন্টার জন্য গৃহস্বামী ঘরদোর সাজিয়ে গুছিয়ে ভোজের আয়োজন করেন বন্ধু স্বজনের জন্য। ঝটিকা সফরে সদলে সবাই এসে ভোজের খুশী ভাগ করে নেন! এবছর আমার বাড়িতে প্রায় ‘শ দেড়েক লোকজন এসেছে। ভোজের টেবিলে ক্যাটারিং থেকে আনা কাবাব, বাটার চিকেন, ছোলার ডাল, ফ্রেশ নানরুটি , সালাদ। আর আমি বড় এক হাড়ি গরুর মাংশ, এক হাড়ি আস্ত মুরগির মাংশ (ছাটনার হাড্ডিগুড্ডি বাদ) ছোট ছোট টুকরো করে কেটে, দই এবং আদা, রসুন, হ্লুদ, মরিচ, ধনে, জিরে, গরম মশলা দিয়ে রান্না করে নামানোর আগে বেশ কতক ফ্রেশ লেবুর পাতা ও লেবুর রস চিপে দিয়ে হাড়ি ঢেকে দিয়ে চুলা বন্দ করে দিয়েছিলাম। জুন মাসের ভ্যাপসা গরমে লেবুগন্ধি মুরগি চমৎকার লেগেছে খেতে। ডেজার্ট ছিল দুধ সেমাই, রসোগোল্লা, চমচম আর চকলেট!!

ঈদের আমেজ এবার ভালোই জমেছে!! সবচেয়ে অবাক হয়ছি  বারহেবেনের নবনির্বাজিত এম পি মাননীয়  চন্দ্রা আরিয়া যখন ঈদ পার্টির দাওয়াত দিলেন তার অফিসে!!! ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন বিরল দৃস্টান্ত অটোয়াতে দেখে যেতে পারবো কে ভেবেছে???

 

Facebook Comments