ইমিগ্রান্ট কড়চা , আসমা খান Immigrant Diary (Generations) Asma Khan

377

ইমিগ্রান্ট কড়চা , আসমা খান  Immigrant Diary (Generations) Asma Khan

পড়াশোনায় ভীষন অমনোযোগী দুরন্ত দুই কিশোরকে যখন নুতন মাস্টার বললেন ‘ চলো খেলতে যাই, চলো’, সানন্দে তারা বাগানে বেরিয়ে এলো। বেশ খানিক কানামাছি খেলে গাছের ডালে পাখীর বাসা দেখে মাস্টার সাহেব বড়কে গাছে তুলে দিয়ে বললেন দেখতো পাখী আছে বাসায়? বড় উত্তর দ্যায় ‘না, নেই’, নিচ থেকে প্রশ্ন করেন ‘ডিম আছে?’ বড় উত্তর দ্যায় ‘আছে, চারটে’। নীচ থেকে মাষ্টার বলেন ‘একটা দেখি?’ ডিমটি নিয়ে ছোটকে দেখান, বড়কে জিজ্ঞেস করেন ‘আর কয়টা ডিম আছে?’ হটাৎ ছোট চিৎকার করে ওঠে ‘ও ভাই নাইমে আয়, মাস্টার আমাদের অংক শিকোচ্ছে’। সব সময়ই ছোটরা মনে হয় একটু বেশি চালাক চতুর হয়!

তো এসব হোলগে আমাদের ছেলেবেলার গল্প। যখন কিশোররা সদলে গুলতি নিয়ে বন বাঁদার চষে ফিরতো, ফল পাঁকুর, ডাঁশা পেয়ারা, কাঁচা আম  বা ময়না কাক্তুয়া কাঠ-ঠোকড়ার খোঁজে। দাপিয়ে খেলতো সন্ধ্যা পর্যন্ত। ঘরে ঘরে সন্ধ্যার পর হারিকেনের আলোয় গোল হয়ে বসে গলা ফাটিয়ে দুলে দুলে পড়ত ‘পৃথিবীটা কমলা লে…, পৃথিবীটা কমলা লে… পৃথিবীটা কমলা লে… বু …উ’  র মতন গোল’। চ্যাপ্টার ধরে ঝারা মুখস্ত, অপারগতায়  ক্লাস টিচারের ঝপাঝপ চিকণ বাঁশের (কুঞ্চির)মার। ছেলে পিলের দেখভালের দায়িত্ব মায়েদের কাঁধেই ছিল, এবং  দূরদর্শি মায়েরা অনেক ক্ষেত্রেই  স্রোতের উল্টো চলেছেন। সেটা করতে নিজে হাত ধরে সন্তানকে  পার করে দিতেন পুকুর ঘাট, এজমালী উঠোন যেখানে অন্য জ্ঞাতী ভাইরা মার্বেল বা ডাং গুলি খেলছে বা সাতার কাটছে।  স্কুলে নিবেদিত প্রান শিক্ষক সন্তান স্নেহে শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁদের সযত্ন তত্বাবধানে মেধাবীরা অনায়াসেই একেকটি শ্রেনীর চৌকাঠ ডিঙ্গিয়ে গেছে তর তর করে।

ছেলেমেয়েরা যখন বৃটিশ প্রাইভেট স্কুলে ভর্তি হোল তখন সময় বদলে গেছে। ঘরে ঘরে টিভি, ভি সি আর, এমন কি বাজারে কম্পিউটারও নেমে গেছে দামে আক্রা এই যা! তাদের পড়াশোনার ভাষা, কারিকুলাম বৃটিশ। স্কুল যে কত আনন্দের যায়গা, কত কিছু যে শেখার, কিভাবে মেধাকে উস্কে দেয়া যায়, জ্ঞানের জগতের সাথে মনের জগতের সংযোগে যে কি যাদু , সুপ্ত প্রতিভাকে কিভাবে ফুলকির মত জাগিয়ে দেয়া যায় এটা উপলব্ধি করলাম!!

আগেই বলেছি যখন শুধু অক্ষর জ্ঞান থাকলেই মেয়েদের জন্য যথেস্ট মনে করা হোত তখন  আমার মা ঠিক করেছিলেন বি এ পাস করার আগে মেয়েদের বিয়ে দেবেন না। আর আমার শ্বাশুরী তাঁর চার ছেলেকেই ইঞ্জিনীয়ারিং পড়িয়েছেন। আমার স্বামী কিশোর কালে সদ্য কেনা বাইসাইকেল পার্ট বাই পার্ট খুলে পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন তিনি আবার সেটিকে আবার আস্ত সাইকেল বানাতে পারেন কিনা। খুলতে কয়েক ঘন্টা লাগলেও জোড়া দিতে কয়েক দিন লেগেছিল। মায়েরা সন্তানের সাথে উৎসাহ দিয়ে আগ্রহের বীজ বুনেছেন সব সময়।

’৯৫ এ বাহরায়েন ভার্সিটিতে সামার কোর্সের জন্য আমাদের জনবিরল ক্যাম্পাসে থাকাকালীন সময়ে কথা। আমার স্বামী ভার্সিটিতে সি প্লাস প্লাস পড়াবেন থার্ড ইয়ার স্টুডেন্টদের। তো আমি আমার তিন টিন এজ কন্যা ও স্বামীকে এক ঘন্টা সময়ের বিনিময়ে প্রতিদিন তাদের পছন্দের স্ন্যাক্সের অফার করলাম। নিজেদের দখলে দিনের তেইশ ঘণ্টা প্লাস মজার নাস্তাপানি!! এ মওকা কে ছাড়ে? একেবারে একপায়ে খাড়া হয়ে তড়িঘড়ি জিজ্ঞেস করে কি করতে হবে? আমার স্বামীর ভার্সিটির কোর্স্টাই সহজ করে মেয়েদের পড়াতে হবে এবং মেয়েদের সেটা পড়তে হবে।

হোয়াইট বোর্ড, টেবিল চেয়ারে সাজানো স্টাডি,  ক্লাস্রুম হয়ে গিয়েছিল। মেয়েদের লেখাপড়া এবং শেষে ফাইনাল পরীক্ষা এবং বিজয়ীর পুরস্কারও ছিল। তিনি পরীক্ষা শেষে বিজয়ী ঘোষনা করে বিশ্রামে গেলেন। পরাজয় মেনে নেয়া কিন্তু বেশ কঠিন। জয়ীর খাতা তন্ন তন্ন করে ভূল বের করে দুই মেয়ে বাবার কাছে হাজির। তিনি মেয়েদের আপত্তি শুনলেন, গভীর মনোযোগে অনেক সময় নিয়ে খাতা দেখলেন,বিজয়ীকে ফের ভুলটা সম্পর্কে প্রশ্ন করে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে গেল, এ যেন ‘ইউরেকা মোমেন্ট’। তিনি  হারু মেয়েদের বললেন ভুলটা আসলে ভূল নয়, ওটা প্রশ্নটির অন্য রকম উত্তর, যেটা তাঁর ও মাথায় আসেনি। একই সমস্যার একের অধিক সমাধান থাকা সম্ভব।

ছবির মত সাজানো শহর অটোয়া। ইমিগ্রান্ট হিসেবে এখানে বসত করার পর মেইন পাব্লিক লাইব্রেরীতে প্রথম যেদিন গিয়েছিলাম মনে হয়েছিল ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি…’   বই পাগল মেয়েদের ড্রিমল্যান্ড। ইমিগ্রান্ট আমরা, নিজ দেশে আমাদের হাতিশালে হাতি, ঘোড়াশালে ঘোড়া না থাকলেও শিক্ষায়, পেষাগত দক্ষতায়, সামাজিক মর্যদার অবস্থান থেকে এদেশে এসে  একেবারে শুরু থেকে শুরু করা বড়ই বেদনা দায়ক। আমরা মনকে প্রবোধ দেই পরের প্রযন্মে ‘আমার ছেলে যেন থাকে দুধে ভাতে।‘

একবিংশ শতকে এসে তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে সভ্যতা এমন উচ্চতায় উঠেছে, এত ব্যাপক বিশাল এর বিস্তার যে সাধারন মানুষ যেন গোলক ধাঁধায় ঘুরছে। প্রত্যক যুগেই সমাজে সুযোগ সুবিধা যেমন থাকে, সমস্যাও তেমন থাকে। আমাদের আগের প্রযন্ম ছিল একান্নবর্তী, মহিলাদের ধান পাট সামলে সন্তানের দেখভাল করতে হোত, পরিবারে কুটকাচালি থাকলেও মায়া মহব্বতও ছিল । সম্পর্কের হিসেব ছিল সহজ সরল। উন্নত জীবনের আশায় আসা ইমিগ্রান্ট পরিবার হয়ে গেছে স্বজনহীন একা। একাকিত্ব ঘোচানো। বা সংসার চালানোর জন্য চাকরি  (নুন্যতম মুজুরি হলেও ) করে এসে ঘরের কাজ এবং ছেলে পিলের দেখভাল করা বিশাল গুরু দায়িত্ব। এখন হচ্ছে সৃজনশীলতার যুগ, নিত্য নুতন আবিস্কার,  জ্ঞানের পরীধিকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে। সেদিন হয়তো বেশি দূরে না আমাদের নাতী নাতনীরাই মিউজিয়ামে দল বেঁধে যাবে উধাও হয়ে যাওয়া ছাপানো বই দেখতে!!

প্রিয় বোন ও ভাবী, আমরা জানি মানুষ দল বেঁধে থাকে। বনে পশু পাখী, সাগরে মাছও ঝাঁক বেঁধে চলে। এখানে স্কুল ওয়ার্ক নিয়ে পড়াশোনা নিয়ে আসলেই বেশি ভাবতে হয়না, স্কুলে শিক্ষক উৎসাহ দিয়ে অনুপ্রানিত করে বাচ্চাদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেন। আগ্রহি বাচ্চাদের জন্য সুবর্ণ সুযোগ। বাচ্চারা পড়তে না চাইলেও করার তেমন কিছু নেই, অনুপ্রানিত করা ছাড়া। আমি যেটা বলতে চাচ্ছি সব যুগেই যেটা সমস্যা হিসেবে ছিলো, তাদের সংগ দেয়া। সমাধান হিসেবে আমরা মনে করছি সপ্তাহ অন্তে দল বেঁধে দাওয়াত দিলে আর খেলে ছেলে পিলে সংস্কৃতি শিখবে। আমরা যখন মজার মজার চৌদ্দ পদের খাবার, শারি বাড়ি গাড়ি গয়নার গল্প করছি, তখন অন্য ঘরে স্মার্ট ফোনে ছোটরা কি করছে? ছোটরা অসম্ভব বুদ্ধিমান ও সৃজনশীল, ইন্টারনেট অথৈ সাগরের মত, আর স্মার্ট ফোন যেন অরক্ষিত ভেলা।  তাদের নিরাপত্তার দিকটা অন্তত দেখুন।

 

Facebook Comments