ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান Immigrant Diary, Asma Khan

355

ইমিগ্রান্ট কড়চা,  আসমা খান Immigrant Diary, Asma Khan

আমাদের কিশোরী বেলাটা কেমন ছিল?  আমার কাছেতো এখনও বড় মোহময় মনে হয়! তখনকার সময়ে এত ঝলমলে চটকদার তথ্যপ্রযুক্তি ছিল না, আরে ইলেক্ট্রিসিটিই তো ছিলনা। তবে প্রকৃতি তার সমস্ত সজীবতা উজার করে মনকে স্নিগ্ধ করে দিত।হটাৎ বেড়ে ওঠা ছেলেরা খেলা ধুলা করে বাইরে বাইরেই কাটিয়ে দিত বিকেল বেলা। মেয়েরা ঘরের আলনা গুছিয়ে, পড়ার টেবিল গুছিয়ে, চুল বেঁধে বান্ধবীর সাথে গল্পগুজবে বিকেল পার করতো।কিশোরীবেলাটা বড়ই হাস্যমুখর, এবং হাসি সাধারনতঃ সংক্রামক, তুচ্ছ ঘটনায়ও সবান্ধব হেসে গড়িয়ে পরে এ ওর গায়ে!যেমন ধরেন এক রিক্সায় দুইজন মোটা যাত্রী উঠেছে, সেটা থেকেই শুরু হোত ‘এই শোন ঐ রিক্সার দিকে দ্যাখ, হি হি হি এক্ষুনি হি হি হি চেইন পড়বে, হি হি হি, আরে না, হা হা চাক্কা হা হা…

বাড়ির পরিবেশ ছিল পড়ুয়া পরিবেশ। স্কুলে পুরস্কার দেয়া হোত ভালো ভালো বই। বাৎসরিক পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে পাড়ায় রীতিমত জল্পনা কল্পনা হোত কোন কোন বাড়িতে প্রাইজের বই আনতে ঠ্যালা গাড়ি লাগবে!(চার বোন একই স্কুলে বিভিন্ন ক্লাসে পড়েছি) ঘরে ঘরে পড়ার মত কিছু না কিছু থাকতো। সন্ধ্যায় আমরা যখন সবাই মিলে হোম ওয়ার্ক করতে বসতাম আম্মাও সিরাতুন নবী বা বিষাদ সিন্ধু নিয়ে বসতেন। তখন বছরের শুরুতেই পাঠ্য বই এ মলাট দেয়ার রেওয়াজ ছিল, আর আমার মত ফাঁকিবাজের জন্য ছিল এ এক সুবর্ণ সূযোগ। আমি মলাটের নীচে দেদারছে গল্পের বই পড়তাম। আম্মা বুঝতে পারতেন না? আলবত পারতেন, কিন্তু চেক করতেন না কারন এটা ভালো অভ্যাস। হারিকেনের চিমনি ধোঁওয়ায় কালো হয়ে গেলেও মন অন্য ভুবনে আলোকিত হোত!পাড়াতো বান্ধবীরাও আমার মতনই বই পাগল ছিল।

মেয়েরা আমার মতই বই পড়ুয়া। তাদের কিশোরীবেলা খানিকটা কেটেছে বাহরায়েনে। তাদের প্রতিটা ক্লাস টেস্টে ‘এ’ পাওয়ার পুরস্কার দিতাম একটা পছন্দের বই। গরমের ছুটিতে বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়ে নিউমার্কেটে বইএর দোকানে গিয়ে দেখে বাহরায়েনের একটা বই এর টাকায় ঢাকায় চারটা বই কেনা যায়। ফলে দেশ থেকে বাক্স বোঝাই বই কিনে ফেললো তারা । কানাডা এসে বই এর অভাবে পড়তে হয়নি।বই পড়াটা আসলে একটা ভালো আভ্যাস। প্রথমে সামনে যা পায় তা পড়লেও ক্রমশ পড়তে পড়তে নিজস্ব একটা রুচি গড়ে ওঠে।

দুই হাজার পাঁচ সালে মেজ কন্যা সোমবারে ভোর সকালে অটোয়া এয়ারপোর্ট থেকে ফ্লাই করে নিউইয়ররকের ম্যানহাটনের ডেলওয়েটে অফিস করে বিলাসী হোটেলে রাত্রি যাপন, এবং শুক্রবার বিকেল পাঁচটার ফ্লাইটে ফের অটোয়ায় বাসায় ফিরে আসা নিঃসন্দেহে অন্য রকম গল্প! একটা ক্যারিঅনে লাগেজে পাঁচদিনের পোষাক আশাক, টুথপেস্ট ব্রাশ, ইত্যাদি নিয়ে যাযাবর জীবন। যে জিনিসটা আমাকে চমৎকৃত করে তা হোল হাইটেকে কাজ কিভাবে সময়মত নির্ভুল ভাবে আগায়, তার উপর পুরস্কার, তিরস্কার!!তো মেয়ে তার প্রজেক্ট ডেলিভারি করে অফিস থেকে জিতে নিল বাজারে সদ্য নামা আমাজনের লেটেস্ট ‘কিন্ডেল’! উরিব্বাস! একটা পেপারব্যাক বই এর ওজন ও আয়তনে পুরো আমাজনের বইএর সেলফ হাজির!যাযাবর একাকী জীবনে অবসরের যোগ্য সঙ্গীই বটে।

মিলেনিয়াম কিশোর কিশোরীরা কি বই পড়ে? এই ঝলমলে যাদুময় প্রযুক্তির অপার সম্ভাবনা যখন হাতের স্মার্টফোনে। তখনো?আমার তো মনে হয় তাদের সেই ধৈর্য্য মায়েদের যথেস্ট বিনিয়োগ করতে হবে। খোলা চোখে তাকালে দেখবেন লাঞ্চ ব্রেকে টেবিলের এধারে ওধারে একদল ছেলে মেয়ে বসে শিথিল ভঙ্গিতে বসে মাথা নিচু করে হাতের স্মার্টফোনে টেপাটিপি করে টেক্সটিং করছে বন্ধুর সাথে, যে হয়ত একই টেবিলে উলটো দিকে মাথা গোঁজ করে তার উত্তর দিচ্ছে, অথবা ফেসবুকে লাইক করছে।ফেসবুক ফ্রেন্ড সংখ্যার লেখাজোখা নেই। সেলফি তুলে পোস্ট করছে। ইউটিউবে পছন্দসই কিছু দেখছে। তাদের সামাজিক ব্যাকারনে টাল মাতাল অবস্থা। এমনিতেই কিশোরবেলা বড়ই সংবেদনশীল, যদিও আমাদের সময়ের মত নাজুক, অজ্ঞ, ভীতপ্রদ নয়, এখন শারিরীক পরিবর্তনের ব্যাপারটা জানে, কিন্ত মানসিক অবলম্বনে বন্ধুর কাছেই তারা দায়বদ্ধ। পরিবারের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়নের কারন হচ্ছে এই বদলে যাওয়া দেহ আর মন।

আচ্ছা কি হয় যদি  ‘কোবো’ ‘নুক’ বা ‘কিন্ডেল’ দেয়া ছেলেপিলেকে শোবার আগে অবাক করা উপহার হিসেবে?(এখন ই অন লাইনে একটু খেয়াল রাখলে সেল পাওয়া যায়) আর তারপর রুটিন করে সবাই বিভিন্ন পড়া বই এর গল্প করি, নিজেরাই এক পারিবারিক বুকক্লাব গড়ে তুলি? জানা শোনাদের মাঝে তৃতীয় নয়ন বা ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়কে সচেতন করার কথা বলি? জ্ঞানের পরিধীকে বাড়াই? মনের সাথে মনের সেতু গড়ি, স্মৃতি গড়ি? স্বভাবতঃ প্রশ্ন উঠবে ঘরের ল্যাপ্টপ, আইপ্যাড, এবং জনে জনে হাতের স্মার্টফোনে কি দোষ করলো? আসলে ই-রিডারে বই পড়া দৃস্টি বান্ধব। আর এ জমানায় একটা ভালো অভ্যাস গড়তে কিছু বিনিয়োগ করা যায় বৈ কি।

হটাৎ করেই গায়ে গতরে বেড়ে ওঠা কিশোর/কিশোরীর মনটা কিন্তু সেই শৈশবের মতন স্নিগ্ধ অমলিন থাকে, বাস্তবের প্যাঁচ ঘোঁচ না বোঝায় পদে পদে ধাক্কা খায় আর হতাশায়, ক্রোধে নিজেরাও ভোগে অন্যদেরও ভোগায়।দপ করে জ্বলে ওঠা মেজাজ। ঠাস করে মুখের উপর বন্দ করে দেয়া দরোজার ওপাশে অবুঝ রাগে ফুঁসতে থাকা কিশোরকে খুশি করা অত সোজা নয় মোটেও। তাই ঘরে ঐ সব বইএর গল্প বলা মানবিক মুহুর্তগুলির মুল্যে অপরিশীম।ওদের পছন্দের বই (মনে রাখতে হবে কিশোরদের পছন্দ সব সময়ই খানিক অদ্ভুত, তাদের বন্ধু ঘেঁসা)সেটা মেনে নিয়ে তাদের আনন্দের জন্য ভালো অভ্যাসটা যদি গড়ে তোলা যায়, চেস্টা করতে ক্ষতি কি?

Facebook Comments