Immigrant Diary (SNMC), Asma Khan, Ottawa: ইমিগ্রান্ট কড়চা (SNMC) , আসমা খান

339

ইমিগ্রান্ট কড়চা (SNMC) , আসমা খান

’১৫ সালের ৪ঠা জানুয়ারীতে হয়েছিল SNMC Center and Masjid এর উদ্ভোদন। এবেলা বলে রাখি আমাদের ছোটবেলায় ঘরে ঘরে কেক কেটে হ্যাপি বার্থডে হোতনা মুরুব্বীদের মুল্যেবোধে আঘাত দেবার ভয়ে। তো মসজিদের উদ্ভোদনে অটোয়ার la Breioche থেকে চমৎকার  বিশাল কেক কেটে বিভিন্ন এথেনিক মিস্টি টিস্টি বিলিয়ে সন্মানিত ধর্মীয় নেতা, প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ, আলোচিত সামাজিক নেতাদের সঙ্গে প্রায় হাজার খানেক ধর্ম, বর্ণ, জাতী নির্বিশেষে স্থানীয় লোকজন অংশগ্রহন করেন। CBC TV এর সাংবাদিক ও ক্যামেরাম্যান সাক্ষাৎকার নিতে ব্যাস্ত। দিন শেষে বড় কঠিন এক প্রশ্ন করলেন চেনা একজন,

‘আসমা এইডা তুমরা কি করলা? এমুন হারাম কাজটা করলা? অমুসমানগো ঢুকাইয়া, কেক কাইট্টা মসজিদের এমুন বেইজ্জত করলা?’

এমন হারামের তোপের মুখে হর হামেশাই পড়তে হয়েছে আমাদের শুরু থেকেই। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে আর লাভ নেই। আমরা মুসলমানঃ আমাদের সাকিন অটোয়া হলেও জন্মসুত্রে আমরা এশিয়া আফ্রিকা থেকে এসেছি, যেখানে দেশে দেশে যুদ্ধের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে, অথবা পরস্পরে শ্ত্রুতার উছিলা খুজছে। এমনিতে সাধারন মানুষ শান্তিপ্রিয়, সামাজিক, নিজের সংস্কৃতিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কিন্ত জাত্যাভিমান প্রবল, এটা মানব ধর্ম। তাই কানাডার পাঁচ মিশালী সমাজের ধর্ম, বর্ণ, ভাষার চৌহদ্দিতে নিজ নিজ সমাজের মেজাজ ধরে রাখতে চেস্টা চালায়।

’৯৭ সালে আমরা যখন বারহেভেনে নুতন বাড়ি কিনে বসত শুরু করি, আশে পাশে মাকড়শার জালের মত আলোকিত রাস্তার পাশে জংলা জমিতে সবে পটাপট বাড়ি ঘর তৈরির ভরমৌসুম । নুতন দেশে এসে যে অসহায় পরিচয়হীন নিঃসঙ্গ হাহাকারের মুখোমুখি হওয়া সেই শ্বাসরোধী কষ্টকে মনে রেখেই আমার দুরদর্শী স্বামী সেখানে মসজিদের সাথে সমাজকেন্দ্র বানানোর প্রয়োজন হাড়ে মজ্জায় বুঝলেও ব্যাপারটা অনেক জটিল ছিল।  আমজনতার জাতী, ভাষা, বর্ণের দেয়াল ভেঙ্গে সবার সাথে অবাধ মেলা মেশা যথেস্ট সময় সাপেক্ষ ছিল। অন্য সংস্কৃতির সাথে মিল অমিলের সমঝোতার মনোভাবে কিছু জাদু রসায়ন লাগে, সমাজে পরস্পরকে মেনে নেয়া আর সমবেত ভাবে কোন বিশেষ সামাজিক কাজে উৎসাহী হওয়া এক কথা নয়।

’০৭ সালে আমার স্বামী স্বেচ্চাশ্রমে SNMC নামে একটি ব্যাতিক্রমী চ্যারিটি অর্গানাইজেশন খুলেছিলেন, এবং ’০৯ সালে ৩০২০ উড্রফ এভিনিউ এ তিন একর জমি কেনা হয়েছিল। যেন জাদুর ছোঁয়ায় সমস্ত কমিউনিটি জেগে উঠেছিলো। আমার স্বামী হাইটেকের চাকরী করা সহ দৈনিক প্রায় ১৭/১৮ ঘন্টা পরিশ্রমে ফান্ড-রাইজিং এ যত রকম সৃজনশীল পদ্ধতি সম্ভব সবগুলি অবলম্বন করে, সব্বাইকে সহ  মসজিদ ও সমাজ কেন্দ্রের ডিজাইন, সিটির অনুমতি, কন্ট্রাক্টর নিয়োগ দেয়া, ইত্যাদি সামলাতে লাগলেন। ’১১ সালে চাকরী থেকে অবসর নিয়ে স্বেচ্ছাশ্রমে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করলেন একাজে। বারহেভেনের সমস্ত মুসলিম কমিউনিটির সক্রিয় উৎশাহী অংশ গ্রহনে, সাড়ে আট মিলিয়ন ডলারে, দুইবছরে চমৎকার এই স্থাপনা শেষ হয় ’১৪ সালের ডিসেম্বরে।

উল্লেখযোগ্যঃ

১। সাধারনত ইমাম (যদিও পেইড অফিসার) যে কোন মসজিদের এবং কমিউনিটির আধ্যাত্মিক ও সামাজিক কর্মকামডের পুরোধায় থাকেন, এবং বিভিন্ন মাযহাবে সংজ্ঞায়িত করেন। আমাদের  ইয়োরপীয়ান ইমাম উদার, প্রাজ্ঞ, চমৎকার বক্তা  (Ph.D in Education).

২।সার্বজনীনতাঃ এ মসজিদে সব জাতী, ভাষাগোষ্ঠি, বর্ণ, মাযহাব, মহিলা, বৃদ্ধ, শিশু কিশোর এবং অবশ্যই সকল মাযহাবের মুসলমানকে সুস্বাগতম জানানো হয়।

৩। অন-লাইন পে-প্যাল, ডাইরেক্ট ক্রডিট ডোনেশন, অটোমেটিক ব্যাংক ডিডাকশান, ডেবিট ক্রডিট টার্মিনাল, আর সনাতন ক্যাশ আর চেক তো থাকারই কথা।

৪। ফান্ডিংঃ প্রজেক্টের ৫০% বারহেভেন, ২৫% অটোয়া আর বাদ বাকি ২৫% পুরো কানাডা্র আমজনতা থেকেই সংগ্রহ হয়েছে।

৫।সংজ্ঞায়িত একাউন্টঃ সৃস্টি করা, যেমন মসজিদ ও সমাজকেন্দ্র প্রজেক্ট, কমিউনিটি অনুদান(যাকাত,সাদাকা), বিভিন্ন সার্ভিস(কোরবানী, হলভাড়া)ইত্যাদি

৬। আলিশান ফান্ড-রাইজিং ডিনার এবং বিভিন্ন শহরে স্মরনীয় ফান্ড রাইজিং ট্রিপ।

৭। ব্রডকাস্ট এবং পডকাস্টঃ রজার্স টিভি কমিউনিটি চ্যানেলে নিয়মিত সাক্ষাৎকার, আর গত দশ বছর প্রতি সপ্তাহে নিউজ লেটার প্রকাশ করে জনসংযোগ, নিয়মিত খবরা খবর আপডেট করা।

৮। পরস্পর প্রায় অচেনা মুসলমানদের নিয়ে এক সমৃদ্ধ জনপদের সৃস্টি করা, আশে পাশের স্থানীয় কানাডিয়ান হাইস্কুলে প্রতি বছর দুটো করে বৃত্তি দেয়া, কলেজে ও দুটো ইউনিভার্সিটিতে তিনটে করে বৃত্তি দেয়া, যেকোন জাতীয় বা আন্তর্জাতিক প্রাকৃতিক দুর্যোগে দান করে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখা এই সমাজের জন্য একটি অত্যন্ত দৃস্টি নন্দন মসজিদ ও সমাজকেন্দ্র নির্মান ও প্রতিষ্ঠা শেষে ’১৫ সালে আমার স্বামি snmc এর প্রেসিডেন্ট পদ থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নিলেন।

প্রযুক্তি আর রাজনীতির হাত ধরে আসা সামাজিক জটিলতার যুগ এটা। আমাদের ধর্ম, বর্ণ, ভাষার পরিচয়ে পরিচিত করার যে প্রবণতার শিকার হতে চলেছি তার প্রেক্ষিতে সকলের সচেতন হবার সময় এখন। পরস্পরের সাথে যে ঘনিষ্ঠতা বোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, স্মৃতি বা স্বপ্নে শান্তিময় পরিচিতির যে চৌহদ্দি আমরা চাই সেটা পাওয়ার মধ্যে ফারাক যেন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে।। সামাজিক জটিল রসায়নে নিজের বিশ্বাসকে সঙ্গে রেখে কানাডিয়ান মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচিত করার সময়ে আমাদের শিক্ষিত, পেশাগত পরিচয়ের সাথে সাথে শান্তিপ্রিয় পারিবারিক, মানবিক পরিচয়ে পরিচিত হতে সচেস্ট হওয়ার অন্য নাম কি ?

 

Facebook Comments