ইমিগ্রান্ট কড়চা (ম্যাপল রস), আসমা খান, Immigrant Diary (Maple Syrup), Asma Khan

281

ইমিগ্রান্ট কড়চা (ম্যাপল রস), আসমা খান, Immigrant Diary (Maple Syrup), Asma Khan

কানাডাতে ফেব্রুয়ারীর শেষে প্লাস টেম্পারেচার আর প্রবল বৃস্টিতে যখন বরফ গলতে শুরু করে তখন কানাডিয়ান ঐতিহ্য অনুযায়ী সপরিবারে ‘সুগার-বুশে’ প্যানকেক আর শীতের জাদু ম্যাপেল রসের মেঠাই খাবার সময়! এবছরতো আবার স্বাধীনতার দেড়’শ বছর উৎযাপন উপলক্ষে অটোয়া সিটি হলেই তিন দিনের ম্যাপল উৎসব হয়ে গেল। দিনের টেম্পারেচার প্লাস পাঁচ এবং রাতেরটা মাইনাস পাঁচে রস আহরন ভালো হয়। এবছর বাইশে ফেব্রুয়ারী থেকে এপ্রিলের তেইশ তারিখ পর্যন্ত রস হারভেষ্ট হবে। অটোয়া প্রকৃতির সাথে মিতালী রেখে সখ্যতা রেখেই নগরায়ন হয়েছে, ফলে  রাজধানীর ধারে কাছেই ‘শ বছরের পুরানো ম্যাপল বাগান shake সহ বহাল তবিয়তে ঐতিহ্য মাফিক সবাইকে পিঠে মেঠাই খাওয়াতে পারছে।

আটই মার্চ SNMC এবং SHAHIB GURU DUARA এর সিনিয়ররা মিলে সুগারবুশে ট্রিপে যাওয়া ঠিক হয়েছে। কিন্ত সাত তারিখে তুমুল বৃস্টি হটাৎ মাইনাস টেম্পারেচারে ফ্রিজিং রেইনে একেবারে খতরনাক রূপ নিল, ভোর সকালে আমার স্বামী বাজারে গাড়ি থেকে নামতে গিয়ে পিচ্ছিল রাস্তায় পড়তে পড়তে কোনমতে বেঁচে গেলেন, তড়ি ঘড়ি ঘরে ফিরে হাঁফ ছাড়লেন। ওমা কি ভাগ্য!! বিকেলে টেম্পারেচার বেড়ে আর প্রবল বৃস্টির তোড়ে সেই পিচ্ছিল গদের আঠা রাস্তা থেকে সাফ হয়ে গেল। ফলে পরদিন সকালে বাস বোঝাই সিনিওর ট্রিপে রওয়ানা দিলাম, এবং সে ট্রিপে স্ফুর্তি কম হয়নি। সমবেত কোরাস, হামদ নাত, গল্পে যাত্রাপথ বড় আনন্দময় ছিল। সেখানে শোনা মজার এক জোকঃ

এক হার্ট সার্জন অপারেশন শেষে উদ্বিগ্ন স্ত্রীর কাছে এসে আশ্বস্ত করলেন, ‘অপারেশন সাকসেস্ফুল’।

স্ত্রী মৃদু কন্ঠে ডাক্তারকে জিজ্ঞেস করেন ‘তুমি তো তাঁর হৃদয় দেখেছো, সেখানে কি অন্য রমণী আছে?’

ডাক্তার সহাস্য উত্তর দেন ‘আরে আমি বাই-পাস সার্জারি করে দিয়েছি তো, তুমি নিশ্চিন্তে থাক’।

বিশাল পত্রহীন ম্যাপল বন আর যতদুর চোখ যায়, শুভ্র বরফের আলাদা এক সৌম্য সৌন্দর্য্য আছে। বরফ ঢাকা ট্রেইল পিচ্ছিল নয়, মিছরির মোটাদানার মত পুরু বরফের স্তর। প্রতিটা গাছে ঢাকনা দেয়া ধাতব কতকটা বালতির মত পাত্র গাছের সাথে ল্টকানো। কৌতুহলে ঢাকনা খুলে দেখি গাছ থেকে নল দিয়ে ফোটা ফোটা করে পানির মত রস পাত্রে জমা হচ্ছে। আমরা সবাই পা টিপে টিপে ঐতিহ্যবাহী shake এর সামনে এসে দাড়ালাম। কাঠের তৈরী দোচালা ঘর। ভিতরে বড় বড় টেবিল। দুই পাশে কাঠের বেঞ্চ। বেঞ্চে বসার পরে প্লেটে প্লেটে চলে এলো প্যানকেক, ডিম, আলুভাজা, জুস, চা, কফি।  মিস্টি মানুষ, কেচাপ দিয়েই খেলাম, সদ্য তৈরী একটু ম্যাপল সিরাপ চেখে দেখি অন্য রকম স্বাদ, সে বড় স্বাদু, আর মোলায়ম।

ম্যাপেল গাছ বাঁচে প্রায় আড়াইশ বছর। গাছের বয়স চল্লিশ বছর হলে রস দেয়া শুরু করে। সাধারনতঃ ফেব্রুয়ারীর শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত রস সংগ্রহ করা হয়। যে রাতে ভালো ঠান্ডা পড়ে এবং সকালে চমৎকার রোদ ওঠে, সেদিন বেশী রস ঝরে। রস আহরন বা জ্বাল দেয়া আগের মত কঠিন ও কষ্টসাধ্য নয়, চল্লিশ লিটার রস জ্বাল দিয়ে এক লিটার সিরাপ পাওয়া যায়। হরেক রকম ক্যান্ডি, টফি এবং বিভিন্ন সাইজের সিরাপের বোতল সুলভে বিক্রি হচ্ছে।

রূপকথার মত অলৌকিক সুন্দর এক পরিবেশে ভিনদেশী সিনিওরদের পাশে বসে আমি স্মরন করি আমার ছেলেবেলার ফেলে আসা দেশের স্মৃতি। যেখানে শীতে খেজুর গাছ থেকে আমরা পাই মিস্টি সুগন্ধি রস। আমাদের ছেলেবেলার সে সময়টা ছিল বড় আন্তরিক, আর সেটার মিস্টি প্রকাশ হোত শীতের সকালে। লেপের নীচ থেকেই টের পাওয়া যেত উঠোনে লাইন দিয়ে রাখা রসের মাটির কলস। যা দিয়ে তৈরী হোত রকমারী পিঠে পায়েস। তৈরী হোত পাটালি গুড়, ঝোলা গুড়।

 ‘সব চেয়ে খেতে মজা পাউরুটি আর ঝোলাগুড়’ কার যেন লেখা এলাইনটা? নরেন্দ্রনাথ মিত্রের ‘রস’ গল্প যে কতবার পড়েছি।

সেসময় ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিলনা, কিন্ত আমাদের মা খালারা ছিলেন উদ্যমী আর সৃজনশীল। খেজুরের গুড়ের পাটালী কত রকমের যে ছিল, নারকেল দেয়া, বাদাম দেয়া, কুলবড়ই এর গুড়ো দেয়া, তেতুলের রস দেয়া, তিল দেয়া, স্বাদে গন্ধে অতুলনীয়।। কানাডাতে  বিভিন্ন  ফ্লেভারের  চকোলেটের  মত!!মেয়েরা  যখন  অন্যান্য অনেক  ফ্লেভারের মত কেইওন মরিচের ফ্লেভারের  চকলেট  খেয়ে  ব্যাতিক্রমি  স্বাদে উদ্ধেল, আমাদের মনে আছে একবার আমাদের এক চাচী খুব ঝাল ছোট্ট ছোট্ট ধানী মরিচের ফ্লেভারের কয়েকটা পাটালী পাঠিয়েছিলেন!) মুড়ি ভরা টিনে ঐ সব পাটালী রেখে দিলে মুড়ি নরোম হয়ে গেলেও পাটালী ফ্রেস থাকতো বহুদিন। তখন ঝোলাগুড় থাকতো মাটির কলসিতে বেশ কিছুদিন, ক্রমশ সুন্দর খসবুটা মিলিয়ে যেত।

রস থেকে বানানো পিঠে পায়েস, মিস্টি, নৈলেন গুড়ের সন্দেস এখনো খুব পপুলার। সময়ের সাথে সাথে  কত সব ব্যাতিক্রমি খাবার  হারিয়ে গেছে।  যত বিচিত্র,যত পুরনো, তত বনেদী হয় যে কোন জাতীর  ঐতিহ্য,তাই  ঐতিহ্যর খাতিরেই সেগুলি আবার ফেরত আনা যেত যদি।  আর এখনতো ডিপ ফ্রিজে বছরভর গুড় রাখা যায় অনায়াসে। এখন চাহিদার সাথে সাথে যোগানের জন্য যদি নুতন নুতন খেজুর বাগানের পত্তন, আর গাছিদের আর কারিগরদের ট্রেনিং দেয়া যায়, বাগানের লাগোয়া ট্যুরিষ্টদের জন্য কুড়েঘর মোটেলে একরাতের থাকার ব্যাবস্থা, আর সকালে তোফা পিঠে নাস্তা, আহা! তাহলে তো সোনায় সোহাগা!

’৭৪ সালের কথা। আমাদের মহিলা কলেজে ছিল এক ডাকাবুকো মেয়ে। কলেজের মাঝ পুকুরের দিকে একেবারে হেলে পড়া খেজুর গাছে গাছি ছোট্ট রসের কলসি ঝুলিয়ে দিয়ে গেছে কখন আমরা জানি না, সেই মেয়ে ওড়না কোমরে বেঁধে, কোথা থেকে যেন হাত দুয়েক লম্বা এক দড়ি যোগাড় করে সেটার দুই প্রান্তে গিট্টু দিয়ে মালার মত বানিয়ে অবলীলায় দুই পায়ের পাতার ঠিক উপরে গলিয়ে দিয়ে তর তর করে খেজুর গাছে উপরে উঠতে লাগলো! আর আমরা জনা কয়েক পুকুর ঘাটে দাড়িয়ে রুদ্ধশ্বাসে তার কারবার দেখছি। গাছের মাথায় পৌছে উচ্ছাসিত স্বরে সে চিৎকার করে ওঠে,

‘উরে আল্লা ঠিলে ভর্তি রস’!

বলে সে রস ভর্তি মাটির কলসটা গাছ থেকে সবে খুলেছে, ঠিক এমন সময় কানের কাছে যেন বোমা ফাটলো, আমাদের ঘাড়ের কাছে বাজখাই গলায় হুংকার দিলেনঃ ‘এসব হচ্ছে কি?’

সভয়ে পিছনে ফিরে দেখি প্রিন্সিপাল আপা।

গাছের মাথা থেকে প্রিন্সিপাল আপাকে দেখে ঐ মেয়ে মাঝপুকুরে ঝপাৎ করে পড়ে গিয়ে বিশাল এক ঢেউ তুলে পানির নীচে তলিয়ে গেল। ঘটনার আকস্মিকতায় বিমুঢ় হয়ে আপা আমাদের জিজ্ঞেস করেন,

‘ও সাঁতার জানে?’

আমরা মাথা নাড়ি জানি না। ভয় আমাদের জাপ্টে ধরে, উৎকন্ঠার সময় যেন পাথরের মত চেপে বসে। আপার ক্ষোভ, ক্রোধ  ব্যাকুল অপেক্ষা উৎকন্ঠায় আর আতঙ্কে রূপ নেয়, হটাৎ ই আমরা খোঁজ পাই নিরাপদ দুরত্বে সাইন্স বিল্ডিঙের পাশে ঘাসে বসে সেই মেয়ে ভিজে কাপড় শুকানোর জন্য রোদ পোহাচ্ছে! আমরা যখন হন্যে হয়ে মধ্য পুকুরে তাকে খুঁজছি, সে তখন ডুব সাঁতারে কচুরিপানা, কলমি শাক মালঞ্চ শাকের আড়ালে আড়ালে পাড়ে্র ঝোপের পাশ দিয়ে নিঃশব্দে পগার পার!!

তারপর???

Facebook Comments