ইমিগ্রান্ট কড়চা, (বৃত্তি ),আসমা খান; Immigrant Diary (Scholarship), Asma Khan

279

ইমিগ্রান্ট কড়চা, (বৃত্তি ),আসমা খান; Immigrant Diary (Scholarship), Asma Khan

ছেলেপিলে পালাপোষা সব সময়েই বড় ঝক্কির কাজ। কিন্তু মায়েরা এটাতে যত্নের ত্রুটি করেন না, কারন জীবনের অনেক অনেক সন্তুষ্টির উৎস মুলে আছে সন্তানের পার্থিব সাফল্য। তাদের মাঝেই নিজেদের অসম্পুর্ন স্বপ্নের বিকাশ দেখতে পান। সন্তানের লেখাপড়ার জন্য বাবা মা তাই আলাদা মনোযোগ দিয়ে থাকেন। কিন্ত প্রথাগত শিক্ষা অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, ভার্সিটির শিক্ষার জন্য কিছু পুর্ব শর্ত থাকে। মেধা, সামাজিক সংস্কৃতি, ছেলে বনাম মেয়ে, আগ্রহ, সামর্থ্য ইত্যাদি। জটিল এবং গুচ্ছ জ্ঞান আহরণের জন্য ভার্সিটির দরোজা গুটিকয়ের জন্য খোলা থাকে, যারা সাফল্যর সাথে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে। দেশে আমাদের সময়ে পঞ্চম, আষ্টম, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে মেধাবীদের বৃত্তি দেয়া হোত মাসিক পাঁচ টাকা, বারো টাকা, পঁয়ত্রিশ টাকা আর পঞ্চাশ টাকা করে, টিউশন ফি আর দেয়া লাগতোনা মেধাবীদের। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের বোর্ডের ফর্ম পুরনের সময় গুচ্ছের টাকা লাগত। যেটা অনেকেরই সাধ্যর বাইরে, ফলে অনেকেরই পড়াশোনার ইতি টানতে হোত।

আমার বড় মেয়ে ‘ও’ লেভেলের মক এক্সাম দেয়ার পর দেখি লন্ডনে ‘এ’ লেভেল করার জন্য ফুল স্কলারশীপ পেয়ে গেল। বাহরায়েনে ‘এ’ লেভেল দেবার ব্যাবস্থা নেই, উচ্চশিক্ষার জন্য দেশে অথবা বিদেশে যেতে হবে। ৯৬ সালের ৩রা ফেব্রুয়ারী সে অটোয়ার ক্যান্ট্রবেরী হাইস্কুলে (তখন গ্রেড থার্টিনে) ভর্তি হোল। আমি তখন তিন ছেলে মেয়ে নিয়ে রিভারসাইডে এক এপার্টমেন্টে থাকি। মে মাসের শুরুতেই কাংখিত সুখবরটা এলো, বড় মেয়ে একাডেমিক স্কলারশিপ সহ কার্ল্টন ভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে। পরের দিন ছোট ছেলেকে বাসে তোলার লাইনে দাঁড়িয়ে পাড়াতো বান্ধবীর কাছে খবরটা বলতেই সে প্রায় তেড়িয়া হয়ে বলে উঠলো(সেটা বাংলায় বলি), ‘তোমরা বাঙ্গালরা এত্ত বড় বড় বাতচিত কর না! দুই মাস হয়নি এদেশে এসেছো, এর মধ্যই স্কলারশিপ সহ ভার্সিটি ভর্তির গুলগাপ্পা শুরু করলা’। ভাগ্যিস ঠিক তক্ষুনি স্কুলবাস এসে থামল, লাইনে দাঁড়ানো ছেলেপিলেরা পিলপিল করে বাসে উঠে স্কুলে চলে গেলে রোজকার মত ফেরার পথে তাকে আমার ঘরে আমন্ত্রন জানালাম চায়ের জন্য। চায়ের টেবিলেই রাখা এনভেলাপটা তাকে খুলে পড়তে দিলাম। পড়া হলে অমলিন খুশীতে জড়িয়ে ধরলো, ভেসে গেল খানিক আগে করা গা জ্বলে যাওয়া কটুক্তি!!

জুলাই মাসে মেজ মেয়ে ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দিয়ে তার আব্বার সাথে অটোয়াতে আসলে আমরা বারহেভেনে মুভ করি। মে্যেরা স্যার রবার্ট বোরডন হাইস্কুলে ভর্তি হোল। হাইস্কুল গ্রাজুয়েশন ডে তে গিয়ে দেখি মেধা এবং বিভিন্ন স্কিলের জন্য কত ধরনের যে স্কলারশিপ আছে উচ্চ শিক্ষার জন্য!! একাডেমিক, স্পোর্টস, বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রি থেকে বৃত্তি দিয়ে মেধাবীদের উচ্চ শিক্ষা কত সহজ করে দেয়। খুব ভালো লাগলো যখন দেখলাম একটি পরিবার দুর্ঘটনায় তাদের অকালেমৃত সন্তানের নামে একটা বৃত্তি দিল (যে ঐ স্কুলেরছাত্র ছিল।)। মা এসে যখন চেকটা হস্তান্তর করলেন হলের সকল অতিথির মন ছুঁয়ে গেল। আরো যেটা উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠানের স্টেজ দখল করে রেখেছিল চাইনিজ এবং ইন্ডিয়ান ছাত্র ছাত্রী, কি তুখোড় মেধা!!

কানাডার দেঢ়শত বছরের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে মহা ধুম ধাম হচ্ছে। চিন্তা ভাবনার ধারা বৈচিত্র এত চমকপ্রদ যে তাক লেগে যায়। এক অভিভাবক জানালেন স্কুলে তার বাচ্চার প্রেজেন্টেশন দিতে হবে কানাডায় তাদের আগের প্রযন্মকি অবদান রেখেছ? অর্থাৎ আমাদের প্রযন্ম? কানাডাতে স্বেচ্ছায় এলেও অভিবাসন সহজ নয়, এবং জীবনের মধ্যবেলায় এসে নুতন করে সব কিছু শুরু করা, পরিচিত হওয়া, রুজি রোজগার করে প্রতিষ্ঠিত হওয়া, জটিল এ সমাজে অবদান রাখা কঠিন, কিন্তু পরের প্রযন্মের খাতিরে আমদের এদিকে খেয়াল করা উচিৎ।একেবারে ছেলেবেলা থেকে শুনে এসেছি, ‘তুমি ডান হাতে কিছু দান করলে তোমার বাম হাতও যেন সেটা না জানে, অর্থাৎ প্রচার কম’। বর্তমানের হালচালে কানাডিয়ান সমাজে আমাদের অবশ্যই আমাদের প্রযন্মের অবদানের কথা জানাতে হবে।

’০৭ সালে SNMC চ্যারিটি স্যাটাস পেলে বিভিন্ন জনহিতকর কাজ শুরু হয়। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবছর বারহেভেনের দশটি হাইস্কুলের প্রতি স্কুলে ছয় ‘শ ডলার  করে তিনটি   স্কলারশিপ, আলগনকুইন কলেজে দশটি স্কলারশিপ প্রতিটি আট‘শ ডলার এবং অটোয়া ওকার্লটনভার্সিটিতে এক হাজার ডলার করে পাঁচটাপাঁচটা মোট দশটা স্কলারশিপ দেয়া হচ্ছে।

স্বেচ্ছায় অভিবাসন মানে স্বদেশকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং দেশ আমাদের সমস্ত অস্তিস্ব জুড়ে থাকে। অনুভুতিতে দেশের প্রতি কৌতুহলি আবেগ জন্মভূমি আর বাসভূমির মানচিত্রের দুরত্বে সেতু গড়ার দায় নেয়। শিকড় ছাটা ইমিগ্রান্টই নুতন বাসভুমিতে পরের প্রযন্মের কাছে উত্তর প্রযন্মের যোগযোগ মাধ্যম এবং দায়বদ্ধ। সে আবেগে ’১২ সালে প্রথমে Non Profit, প্রতিষ্ঠান খোলা হোল এবং’১৩ সালে অটোয়াতে CBET (Canada Bangladesh Education Trust) charity status পেলো। তখন থেকে বাংলাদেশে্র বিভিন্ন কলেজে এ পর্যন্ত মোট প্রায় ছয় শত স্কলারশিপ দেয়া হয়েছে। সরকারী অনুমোদিত শর্ত সাপেক্ষে যেকোন কলেজে দশ হাজার টাকা করে পাঁচটি স্কলারশিপ দেয়া হচ্ছে গত চার বছর ধরে। এবছর SNMC এর মত CBETঅটোয়াতেও বিভিন্ন হাইস্কুলে পাঁচশ ডলার করে মোট পাঁচটি, আলগনকুইন কলেজে সাতশ ডলারের একটি, অটোয়া ভার্সিটিতে এক হাজার ডলারের একটি এবং কার্লটনভার্সিটিতে এক হাজার ডলারের একটি স্কলারশিপ দিচ্ছে।

সাধারনতঃ পৃথিবীর যে কোন দূর্যোগে কানাডিয়ান রেজিস্টার্ড ত্রান সংস্থাগুলি সাহায্যর হাত বাড়ায় যন্ত্রনা কাতর ভঙ্গুর মানুষের কষ্ট লাঘবে। এবাবদ তারা আমজনতার কাছে ডোনেশান সংগ্রহ করে ট্যাক্স রিসিট ইস্যু করেন। বাৎসরিক ট্যাক্স ফাইলের সময় কানাডিয়ান সরকার ৩০% অর্থ দাতাকে ফেরত দেন দানকে উৎসাহিত করার জন্য। মেধাবী ছাত্র ছাত্রীদের অর্থনৈতিক দুর্যোগ বড় নির্মম, বড় কষ্টের, কিন্তু তাদের জীবনে সফল হবার স্বপ্নটাকে তারা শংকা জড়ানো চোখে দেখে, উপায় খোজে। CBET  মেধাবী তরুণ প্রযন্মের আর্থিক দুর্যোগে  আশার ব্যানার!!!

 

Facebook Comments