ফিরিয়ে দাও অরণ্য – নাঈমা চৌধুরী,Give me back my woods – Nayeema Chowdhury

272

ফিরিয়ে দাও অরণ্য – নাঈমা চৌধুরী
Give me back my woods – Nayeema Chowdhury
“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর” – কবির কন্ঠে যা আর্তি হয়ে বাজে আমরা তা বলি নেহায়েত কাব্য করে। বাস্তবে যন্ত্র ছাড়া আমাদের একটি দিনও অচল। শহরের কোলাহল ও যান্ত্রিকতায় প্রাণ যখন হাঁপিয়ে ওঠে তখন মাঝে মধ্যে আমরা তার থেকে নিষ্কৃতি খুঁজি গ্রামে, প্রকৃতির সান্নিধ্যে। কিন্তু অল্প দিনেই আমাদের শহুরে মন উতলা হয় শহরে ফেরার তাড়নায়। তবে এই যান্ত্রিক সভ্যতার যুগে এখনও কিছু মানুষ আছে যারা বেঁচে আছে প্রকৃতির সন্তান হয়ে। তাদের জীবন যন্ত্রের দ্বারা পরিচালিত নয় বরং এর ব্যবহারকে সযত্নে এড়িয়ে চলেছে তারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কৃষি কাজে তারা এখনও মধ্যযুগীয় পন্থাই অবলম্বন করে, তাদের শস্যে নেই কোনো রাসায়নিকের ব্যবহার। তাদের বাড়িতে বিদুৎ নেই তাই নেই ফ্রিজ, টিভি ইত্যাদির মতো কোনো বিদ্যুৎচালিত যন্ত্রপাতি। সেলফোন বা ইন্টারনেট ছাড়া একটি দিনও কি ভাবতে পারি আমরা? ওরা কিন্তু দিব্যি কাটিয়ে দিচ্ছে এসব ছাড়াই। এমনকি যাতায়াতের জন্য এখনও ঘোড়ার গাড়িই তাদের বাহন।

পোশাকেআশাকে অতি সাধারণ এবং অতি শান্তিপ্রিয় এই মানুষগুলো বিশ্বাস করে যুদ্ধ কখনও কোনোকিছুর সমাধান হতে পারে না। আর তাই যুদ্ধের বদলে বারবার নিজের মাতৃভূমি ত্যাগ করে পাড়ি জমিয়েছে দূরবর্তী কোনো দেশে, গড়ে তুলেছে নতুন আবাস। এরা Amish বা Mennonites নামে পরিচিত। ষোড়শ শতকে Anabaptist movement এর ফলস্বরূপ রোমান ক্যাথলিক চার্চ থেকে বেরিয়ে এসেছিল খ্রীষ্ট ধর্মানুসারীদের একাংশ। শিশু ব্যাপটিজমের বিরোধী ছিল এরা। তাদের বিশ্বাস ছিল ব্যাপটিজম সাবালকদের একটি Choice নাবালকদের নয়। এই Anabaptist movement এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন অনেকেই তবে নর্দান জার্মানী ও নেদারল্যান্ডস্-এ এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন Menno Simons নামে একজন প্রাক্তন রোমান ক্যাথলিক যাজক। মেনো সিমন্স এর নাম অনুসারেই তার অনুসারীরা মেনোনাইটস্ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। অপরদিকে Bishop Jacob Amman নামে সুইস আরেকজন Anabaptist leader এর অনুসারীরা পরিচিতি পায় Amish হিসাবে।

ক্যানাডাতে মেনোনাইটস্-রা প্রথম এসেছিল ১৭৭৬ সালে। এরপর ১৮২৫ থেকে ১৮৭০ এর মধ্যবর্তী সময়ে এবং সর্বশেষ ১৯২০ সালে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মেনোনাইটস্ ক্যানাডায় অভিবাসী হয়ে আসে। বর্তমানে এখানে বসবাস করে প্রায় ২০০,০০০ আমিশ ও মেনোনাইটস্।

মেনোনাইটস্-দের বেশিরভাগই বাস করে উইনিপেগ এবং কিচেনার-ওয়াটারলুতে। এছাড়া সাসকাটুন, ভ্যাংকুভার, নায়াগ্রা পেনিনসুলা, ইয়র্ক এবং সাউদার্ন ম্যানিটোবাতেও রয়েছে এদের আবাস। নিজস্ব ভূমি, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত স্বকীয়তা বজায় রাখা এবং মিলিটারীতে যোগদানের ব্যাপারে বাধ্যবাধকতা না থাকাই মূলত তাদেরকে উৎসাহিত করেছিল ক্যানাডায় পাড়ি জমাতে।

মেনোনাইটস্ বা আমিশদের অধিকাংশই যান্ত্রিক জীবনের আকর্ষণ এড়াতে পারেনি। এদের বেশিরভাগই এখন শহরে বাস করে। যারা এখনও তাদের সনাতন জীবনধারা ধরে রেখেছে তারা Old Order Amish বা Old Order Mennonites নামেই পরিচিত।

সেদিন সেইন্ট জ্যাকবস্ এর পথে সহসা পেয়ে গিয়েছিলাম তাদের দেখা। ব্যস্ত রাস্তায় হঠাৎ ঘোড়ার খুরের শব্দে চমকে উঠেছিল আমার শহুরে মন। হুট করে মনে পড়ে গিয়েছিল ঢাকার রাজপথে মানুষের বিনোদনের জন্য ছুটে চলা ঘোড়ার গাড়িগুলোর কথা, যার অধিকাংশই মূলত খচ্চর টানা গাড়ি। প্রাণীগুলোর দুর্দশাই চোখে পড়ত ওগুলোর দিকে তাকালে। কিন্তু এ যে দেখি তাগড়া ঘোড়া টগবগিয়ে ছুটে চলেছে। শহুরে পথে সদর্পে গাড়িতে করে নিয়ে যাচ্ছে তার মনিবকে। ঘোর কাটিয়ে উঠে ওদের পরিচয় বুঝতে না বুঝতেই ঘোড়ার গাড়ি চলে এলো আমার প্রায় সামনে। মুহূর্তেই সচল হলো আমার ক্যামেরা। হয়তো তাদের প্রাইভেসিতে অযাচিত অনুপ্রবেশই করলাম কিন্তু এমন দৃশ্য ধরে রাখার সুযোগ কি করে হাতছাড়া করি বলুন? খুব ইচ্ছে করে দূর থেকে দেখা এই অপূর্ব মানষগুলোর জীবনকে কাছ থেকে দেখি।

Facebook Comments