কানেকশন, ফারজানা মাওলা অজন্তা, Connection, Farzana Mowla, Ottawa

913

কানেকশন, ফারজানা মাওলা অজন্তা

আম্মা চলে যাবার কয়েকদিন পরে এক বিকালে জামালের মা বুয়ার সাথে কথা হচ্ছিলো। অনেক দিনের পুরনো মানুষ, এখন রিটায়ার করে দেশে চলে গেছেন, দুই ছেলে মেয়ে নিজেদের সংসার নিয়ে ঢাকায় থাকে। বুয়া দেশে নিজের ঘর তৈরি করে নিয়েছেন, একা থাকেন। আম্মা চলে যাবার পর ছুটে এসেছেন। বলছিলেন, ছেলে মেয়েরা দূরে থাকে বলে তাঁর মন অস্থির থাকত। আম্মা নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ছেলেমেয়েদের পিছুটান দিয়ো না। ওদের নিজেদের জীবন গড়ে তুলতে দাও। বুয়া নাকি অনেক শান্ত হয়েছিলেন সেই কথার পরে। পোর্চের রেলিং ধরে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে বলছিলেন, এখন আর আমাকে কে এভাবে বোঝাতে পারবে?

কি বৈশিষ্ট ছিল আম্মার কথার মধ্যে? এরকম ভাবে কথা দিয়ে মানুষের মনে প্রভাব ফেলা যায়? কেন মানুষ, দুর-দুরান্তের মানুষও এইভাবে আম্মার জন্য হা-পিত্যেশ করছে?

আমাদের কিরণ খালা, আম্মার চাচাতো বোন, যিনি আম্মা চলে যাবার সাতদিন পরে নিজেও বিদায় নিয়েছেন পৃথিবী থেকে – আম্মা চলে যাবার খবর পেয়ে নাকি ফোন ছুঁড়ে ভেঙ্গে ফেলেছিলেন – আর আমি কার সাথে কথা বলব?

আমার ছোট্ট বেলার বান্ধবী কান্না থামাতে পারছিল না সেদিন। বলছিল, খালাম্মার মধ্যে এত প্রান ছিল – উনি তো আমাদের সাথে আমাদের বয়সী হয়ে যেতেন। এটা ঠিক অস্থিরতায়, চঞ্চলতায় – আম্মা একটা বাচ্চা মেয়ে ছিল। খাবার টেবিলে যতক্ষণ না তাঁর মনে হচ্ছে সবাই সবার সুবিধাজনক যায়গায় বসতে পেরেছে, ততক্ষন আম্মা মিউজিকাল চেয়ার খেলত যেন। আবার সব বয়সী মানুষদের সাথেই মিশেও যেতে পারতো চমৎকার।

নায়িব, আমার ছেলে, আমাকে বলছিল, নিনি অনেক গল্প বলতে চাইত। আসলেই আম্মা অনেক কিছু বলতে চাইত, ছোটবেলার, বর্তমানের, অতীতের – বিরামহীন কথা বলতে চাইত। মানুষের সাথে পরিচয়ের সূত্রপাতেই এমন কথা বলতো, যে যৎসামান্য পরিচয়েও মানুষ তাঁকে ভুলতো না। সেটা তাঁর অসামান্য প্রানবন্ততার জন্যই শুধু না, তাঁর প্রাণখোলা হাসির জন্যই শুধু না – সেটা এই জন্যে যে, আম্মা মানুষের সাথে কানেক্ট করতে পারতো।

কানেক্ট করতে পারত আম্মা – তাঁর কথা দিয়ে, তাঁর লেখা দিয়ে – যোগাযোগ করতে চাইত – মনের যোগাযোগ। যখন চিঠি লিখত, বাদল আমার কাছ থেকে নিয়ে সাগ্রহে পড়ত – বলতো চিঠি এত উপভোগ্য হয় জানা ছিল না। বর্ণনায় মনে হচ্ছে সামনে বসে আছি। চিঠি না – আসলে যেন ছবি আঁকত আম্মা, ভিডিও চিত্র আঁকত – খুব সহজ, ঝরঝরে ভাষায়।

আম্মা আসলে মানুষের সাথে যোগাযোগ করতে চাইতো – আত্মার সাথে আত্মার, গল্পের সাথে গল্পের, সময়ের সাথে সময়ের, অতীতের সাথে বর্তমানের। স্থান-কাল-পাত্র নির্বিশেষে আম্মা মানুষের সাথে অল্প কথাতেই একটা ব্রিজ তৈরি করে ফেলতে পারতো। মানুষের কষ্টের কথা বুঝে নিতে পারতো, আনন্দের অনুভুতির ভাগ নিতে জানত। ছোটবেলায় মনে আছে গ্রামে বেড়াতে যাওয়ার সময় লঞ্চের একদম নিম্নবিত্ত ঘরের এক মহিলাকে সামনে পেয়ে এমন গল্প করেছিল, ঘণ্টাখানেক পরে যখন আমাদের স্টেশন আসলো, উনি আর আম্মাকে ছাড়তে চাচ্ছিলেন না। লোকের কাছে এত আনন্দময় ছিল তাঁর সান্নিধ্য।

আম্মা তো চলেই গেছেন, এমন এক পৃথিবীকে ছেড়ে, যেখানে সেলফোন হাতে আমরা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন একেকটা দ্বীপ। আমাদের কথা বলতে ভাল লাগেনা, ফোন করতে বিরক্তি লাগে, ইমেইল, টেক্সট বা মেসেজেরও উত্তর দিতে ধৈর্য হয়না। চলে গেছেন আম্মা শুধুমাত্র তাঁর ছেলেমেয়েদের উদ্দেশ্যে লেখা চার খন্ডের অসমাপ্ত জীবনী রেখে, তাঁর লেখার খাতা-কলম-ডায়েরী, তাঁর ফোন – তাঁর যোগাযোগের সব উপকরন ফেলে চলে গেছেন। দূরে, গ্রামের বাড়িতে আমাদের হতদরিদ্র আত্মীয়াটি আমার আম্মাকে স্বপ্নে দেখে ঘুম ভেঙ্গে উঠে তাঁর যৎসামান্য সাধ্য থেকে কয়েকটা টাকা দিয়ে জিলাপী কিনে মসজিদে পাঠিয়ে তাই বসে বসে ভাবে, আর কে এখন যোগাযোগ করবে তার সাথে?

Facebook Comments