ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান, Immigrant Diary, Asma Khan Ottawa

75
grandchildren

ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান, Immigrant Diary, Asma Khan Ottawa

একবিংশ শতকে ইমিগ্রান্ট হিসেবে আমাদের নানীবেলার গল্পগাছা কেমন? যদি বলি অন্য রকম সুন্দর! মা হিসেবে যে শিশুকে অসীম আদরে বড় করলেন, সে দিন গুলি কাজের বিচারে অনেক অনেক লম্বা দিন ছিল। ক্রমশ আমাদের ছায়া অতিক্রম করে সন্তানেরা যেন আলাদা ব্যাক্তি স্বত্বায় রুপান্তরিত হয়ে গেল। সম্পর্কের মাঝে একটা অব্যাক্ত  দুরত্ব, অলঙ্ঘনীয় ফাঁকা জায়গার সৃস্টি হয়েছিল অলক্ষ্য, মন ভারাক্রান্ত হলেও প্রজ্ঞায় সেই শুন্যতা পুরন ছাড়া অন্য কোন উপায় ছিলনা। নিয়ম মত ছেলে পিলে লেখাপড়া শেষে চাকরি, বিয়ে করে ঘর ছাড়ে। ভাগ্যক্রমে ছেলেপিলে যদি একই শহরে বসত করে তবে দেখা মেলে, উপরি লাভ নাতি নাতনি।

আমার প্রথম নাতনী জন্মের আগে আমার ছোট কন্যা ছিল ভ্যাংকুভারে, ‘ডেলওয়েট’ এর কন্সাল্ট্যান্ট, সারা ইউরোপ চষে বেড়াচ্ছিল, সুইজারল্যান্ডে অসুস্থ হয়ে হাস্পাতালে ভর্তি হলে আমাদের আঁতকে ওঠার পালা। তারপর অবশ্য ভ্যাঙ্কুভারে অফিসেই ছিল। ডেলিভারী ডেট এর দিন দুই আগের তারিখে আমাদের টিকিট কাটা হয়েছে আঁতুর সামলানোর জন্য। ওমা!! আমরা সেখানে যাবার আগেই সুসংবাদ ‘নাতনী তার মায়ের বোঁচা নাক, আর বাবার রঙ্গ, লম্বা লম্বা হাত পা নিয়ে জন্ম হয়েছে’!

যখন তাকে আমার কোলে দিল, দেখি একেবারে আমার ছোট মেয়ের মুখটা হুবহু শিশুটির মুখের আদলে খোদাই করা, শুধু ফক ফকা ফরসা! নুতন শিশুর আগমনে বাড়িতে সাড়া পড়ে গেল। শিশুর জন্মলগ্নেই সম্পর্কের একটা নিজস্ব ভাষা থাকে, স্নেহের মোহময় আকর্ষন থাকে যা জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। সব্বাই ভ্যাংকুভারে উড়ে গেল দেখতে। রীতিমত উৎসব, উৎসব! তারপর স্বজনের প্রয়োজনীয়তা উপলবদ্ধি করে মেয়ে জামাই দুজনেই চাকরীতে ট্রান্সফার নিয়ে অটোয়াতে এসে থিতু হয়েছে। তাদের সংসার বড় হয়েছে, এবং দ্বিতীয় কন্যার আগমনে হাস্পাতালে গিয়ে দেখি দ্বিতীয় নাতনী তার বাবার চেহারাটা নিয়ে জন্মেছে! খবর পাওয়া মাত্র ট্রেনে করে দাদী এসেছেন। মেমসাহেব দাদীকে যা বলি বাংলায় সেটা এরকম, ‘এ নাতনীতো একেবারে তোমার মত দেখতে হয়েছে’। খুব খুশী হয়ে তিনি উত্তর দেন, ‘আহা! আমি বুঝি এত কিউট ছিলাম?’

প্রকৃতির মধ্যে মানব শিশুরই বোধ হয় দীর্ঘ পারিবারিক পরিচর্যা লাগে, শিক্ষক লাগে, স্বজন লাগে, বন্ধু লাগে ‘মানুষ’ হবার জন্য। স্থান আর কালের সাথে যা জড়িত ও পরিবর্তিত। দেশে আমাদের ছেলেবেলায় খালি ম্যচবাক্স, সিগারেটের বাক্স, রঙ্গিন কাগজ, টুকরো কাপর দিয়ে আমরাই সমবয়সিদের সাথে নিয়ে বানাতাম ‘খেলনা’  চৈত্রমেলায় গিয়ে সামান্য যা মাটির খেলনা কেনা হোত তা ছিল বিরাট পাওয়া। অবারিত প্রকৃতি আর নির্ভরযোগ্য যথেচ্ছ ঘুরে বেড়ানোর জন্য পাড়া আর পাড়াতো বন্ধুর দল আমাদের বিকশিত হবার জন্য ছিল যথেস্ট। পুরো পাড়াই যেন একটি অন্তরঙ্গ পরিবার ছিল। মনকে আলোকিত করার জন্য স্কুল আর বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল হরেক কিসিমের বই।

প্রযন্ম থেকে পযন্মে ফারাক থাকবেই, আমাদের সাথে আমাদের দ্বিতীয় প্রযন্মের ফারাকটা বিশাল কারন তারা মিলেনিয়াম প্রযন্ম। প্রযুক্তির অসীম সম্ভোগ আর সম্ভাবনার সাথে তাদের বেড়ে ওঠা। উল্কা গতিতে প্রযুক্তির উন্নতি, সহজলভ্য গ্যাজেট তাদের যন্ত্র নির্ভর করেছে, আর যন্ত্রও (বিশেষ করে আই-ফোন) মানুষের মত চালাক চতুর হতে চলেছে। যখন জনে জনে মুঠো ফোনে সংযোগ আর অনন্ত সম্ভাবনার বিশ্বস্ত প্রতিশ্রুতিতে এ প্রযন্ম পরস্পরের আস্থা ভাজন, কিন্ত জনবিচ্ছিন্ন, একাকী। সেক্ষেত্রে প্রযুক্তির পাটাতনেই প্রাকৃতিক, সামাজিক আর অন্যান্য মানবিক বিষয় গুলিরও মিলন ঘটানো হচ্ছে। স্বাধীনতার ১৫০ বছর উদযাপনে অন্যান্য উৎসবের মতই অটোয়াতে Jacque carter Park এ MosaïCanada এবছর পুরো পরিবারের সাথে বেড়াতে যাওয়া, গুল্ম ঢাকা ত্রিমাতৃক ভাষ্কর্য, বা মাত্র চার দিনের পথ থিয়েটার La Machine সপরিবারে সকলের জন্যই সমান উপভোগ্য ছিল, এবং সামষ্টিক বোধের জন্ম নিয়েছে, সপরিবারে যারা গিয়েছেন তার সেটা উপলবদ্ধি করেছেন।

নানী নাতনীর সম্পর্কের উড়াল সেতুতে উপভোগ্য অংশ হচ্ছে নানীদের প্যারেন্টিং স্কিলের ট্রায়ালে নেবার জন্য কেউ মুখিয়ে নেই। বরং মমতার অদৃশ্য বন্ধনে অলক্ষ্য মুল্যবোধের যে বীজ নাতী নাতনির শিশুমনে বপন করা সম্ভব সেটাকে পারিবারিক ঐতিহ্য বলা যেতে পারে। বাবা মায়ের দৌড়ের জীবনে ঘরে এসে রাঁধার সময় কৈ? সপ্তাহে অন্তত একদিন নিজ হাতে পছন্দের খাবার রান্না করে তাদের খাওয়ানো ছোট্ট এক পোটলা সঙ্গে দিয়ে দেওয়া, শিশু মন জয় করতে কি লাগে? সঙ্গে করে পিঠে, রুটি বানানো, বাগান থেকে ফুল, ফসল তোলা, বই পড়া, ওজু করা, নামাজ পড়া মোট কথা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে তোলা।

এমনিতে খোলা চোখ দেখলে যে কোন আবাসিক এলাকার ঘর বাড়ি ছিমছাম নির্জন, আর রাস্তা ঘা্‌ট, দোকান পা্‌ট, অফিস আদালত জমজমাট, চলমান। জীবন এখন গৃহবন্দী নয়, বড় গতিময়। নাগরিক জীবনের সুবিধা গুলি যদি বিবেচনায় নেওয়া যায় শোকর করার মত বহুত কিছু আছে। নির্ভরযোগ্য ডে-কেয়ার, স্কুল, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, লাইব্রেরী, পার্ক, মিউজিয়াম, ফার্মার্স মার্কেট, বেরী পিকিং, সুইমিং পুল, আইস রিংক, জিম, গার্ডেনিং, কফিশপ, রেস্টুরেন্ট। যে কোন ষ্ট্রীট মলে বাচ্চা কাচ্চাদের বিনোদনের জন্য বিশেষ দোকান দেখা যাচ্ছে ইদানিং। মায়েরা বা নানীরা অনায়াসে সৃজনশীল আনন্দময় সময় কাটাতে পারেন। এই যেমন ধরুন ‘আর্ট হেভেন’, যেখানে নাতি নাতনীকে নিয়ে সিরামিক পেইন্টিং করা যায় ‘বাবল টি’ চুমুক দিতে দিতে। এখনকার বাচ্চাদের দখলে আছে কত শত খেলনা, আর খেলনাগুলি দেখলে তাদের সাথে কার না খেলতে ইচ্ছে করে।

নানীদের বয়সকালের অভিজ্ঞ জহুরীর চোখ, নাতী নাতনীর বিশেষ আগ্রহ,  দক্ষতা সহজেই ধরতে পারেন, উৎসাহ দিয়ে প্রতিভার স্ফুরন ঘটাতে পারেন। তাদের শাসনের জন্য বাবা মা আছে। নানা নানী থাকবেন আদর, উৎসাহ আর প্রেরনা দেওয়ার জন্য, উচ্চাকাঙ্ক্ষার বীজ বপনের জন্য। কিন্ত বাবা মায়ের শাসনের পরে স্নেহের সাথেই শাসনের কারন বোঝানোটা জরুরি। তারা ছোট থেকেই দেখে দেখে শিখে যায় কত কিছু! খেয়াল করে দেখবেন খুদে বিচ্ছুরা কত কিছু যে নযরে রাখে। আমাদের বাড়ির কাছে ‘ফ্রেসকো’ খুলেছে। সে দোকানে দেশী হেন সবজি নেই যা পাওয়া যাচ্ছেনা। ফলে আমাদের দেশী লোকের বড় প্রিয় মিলনমেলা। তো সেদিন আমার চার বছরের নাতনী এসে জানান দিল সে ফ্রেসকোতে গিয়েছিল। আমি তাকে জিজ্ঞেস করি ‘আচ্ছা, তুমি কি কি দেখেছো?’ উত্তরে সে বলে ‘I saw lots of people like you and nana.’

উরে আমার দোআঁশলা নাতনী!!!

 

Facebook Comments