ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান :Immigrant Diary, Asma Khan

81

ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান:Immigrant Diary, Asma Khan

অটোয়াতে এই সামারের আবহাওয়া একদম অন্যরকম বড় বৃস্টিমুখর, শীতল আর বিষন্ন ছিল। সেপ্টেম্বরে এসে জুলাই মাসের উষ্ণতার ‘রেইনচেক’ এ বাগান ঝলমলিয়ে উঠেছিল। আশা করি উত্তুরে  হিমেল বাতাস গাছ গুলিকে ন্যাড়া করার আগে পাতারা রঙিন সাজে প্রকৃতিকে রাঙ্গিয়ে দেবে, আর মানুষও বনে বাদাড়ে হাইকিং, ক্যাম্পিং এ বেড়িয়ে পড়বে। ইমিগ্রান্টদের এইদেশে ভিন্ন জাতীসত্বার মিশ্র সামাজিক পটভূমিতে প্রকৃতির এই পালাবদল সকলেই সাদরে বরন করে।

কানাডাতে অক্টোবর হচ্ছে ‘ইসলামিক হেরিটেজ মান্থ’। এ উপলক্ষে বিভিন্ন শহরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সেমিনার আয়োজন করছে। পাব্লিক লাইব্রেরীতে অটোয়া মুসলিম ওমেন অর্গানাইজেশন এক সেমিনারের আয়োজন করেছে। আজকের শিখরস্পর্সি সভ্যতায় সপ্তম শতক থেকে আজতক মুসুলমানেরা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিতে কি কি অবদান রেখেছে, তার চমৎকার চিত্র পাওয়া যায় http://www.1001inventions.com/1001inventions. এখানে। একটি বৃটিশ  প্রতিষ্ঠান  1001 Inventions মুসলমানদের অবদানকে আ্লোচনায় আলোকপাত করা হচ্ছে এই বৈরী সময়ে মিশ্র সমাজে পরস্পরে সম্প্রীতি, বন্ধুত্বের করমর্দনের জন্য।

এবছর পহেলা অক্টোবর হচ্ছে পহেলা মহররম ইসলামিক ক্যালেন্ডারের প্রথম দিন, যে দিন আমাদের প্রিয় নবী জন্মভূমি মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনা গিয়েছিলেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের হাহাকার তখনো যেমন ছিল এখনো ঠিক তেমনই আছে। বর্তমান মিয়ানমারে মগদের আক্রমনে রোহিঙ্গা মুসলমানেরা বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। এখনো দলবেঁধে জীবন বাঁচানোর জন্য তারা আসছে, আমাদের নিশ্চয় মনে পড়ে যায় নিজেদের সেই শরবার্থি সময়ের কথা। ঐ সব ছিন্নমূল নিঃস্ব মানুষগুলি মনের গহীনে আমদের স্মৃতি ধরে নাড়া দেয়, আমরা একাত্বতা অনুভব করি। ’১৯৭১ সালের তদানিন্তন পুর্ব পাকিস্তান আর ‘২০১৭ সালের মিয়ানমার। স্থান, কাল পাত্রের পার্থক্য ছাড়াও ‘ভাগ্য’, আর ‘ভালবাসা’, জীবনে বা সমাজে বা রাস্ট্রে বিশাল পরিবর্তন আনতে সক্ষম। যেকোন আটপৌরে সমাজে মানবিকতারই চর্চা হয়, রাস্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের দায় অসহায় নাগরিককে রক্ষা করা, কিন্ত তারাই যখন নৃশংস হন্তারক হয়, অধিবাসিদের পরস্পরে ঘৃনা ছড়ায়, প্রথমে কোন গোষ্ঠীকে অস্বীকার করে, তারপর অত্যাচার করে তাড়িয়ে দেয়, আর বিশ্ব মোড়লরা  এ ব্যাপারে নীরব থাকে, বা সরব হয়, সেই নীরবতার ছত্রছায়ায় যে অবিচারের চর্চা হয় সেটাই সভ্যতার নিকষ অন্ধকার দিক (’১৭ সালের মিয়ানমার)। আর সরব হয়ে ইতিহাস ভূগোল বদলে দেয় (’৭১ সালে বাংলাদেশ)। প্রগতির স্বার্থে ইতিহাস এ আপোষ করে।

 

শরনার্থি শিবিরে নিঃস্ব মানুষগুলি যেন অবাঞ্চিত সীমানায় এক অনিশ্চিত বর্তমানে স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছে, মানবিক কারনেই তাদের সহোযোগীতা করা প্রয়োজন। আজ তারা বেওয়ারিশ, মিয়ানমার তাদের তাড়িয়ে দিয়েছে, আর বাংলাদেশ তাদের দেশ নয়। যদিও প্রবাদে আছে মানুষের ভাগ্যের এক দরজা বন্ধ হলে আরেক দরজা খুলে যায়, কিন্ত প্রায়শঃ মানুষ বন্ধ দরজার শোকে সম্ভাবনার খোলা দরজাটা দেখতেও পায়না। এই ভয়ংকর হতবুদ্ধি সময়ে একটু সহৃদয় সহযোগিতা হয়তো তাদের মনে আশার বীজ বুনবে, হয়তো ক্রমশঃ বিশ্বের দরবারে নিজেদের দাবীর কথাটা নিজেরা বলতে পারবে। বিভিন্ন ত্রান সংস্থা দানের জন্য আবেদন করছে। কানাডার প্রধান মন্ত্রির বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ বব রে যাচ্ছেন মিয়ানমারে। কানাডা পঁচিশ মিলিয়ন ডলার ত্রান সহায়তা দিচ্ছে। প্রায় প্রতি সপ্তাহে অটোয়াতে প্রতিবাদ সভা হচ্ছে, অর্থ সংগ্রহের বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। SNMC প্রায় ষাট হাজার ডলার, আর CBET ও দুই হাজার ডলার দান করেছে রোহিঙ্গাদের জন্য।

 

অতি ব্যাস্ত আমাদের যেকোন সামাজিক বা ধর্মীয় উৎসব দৈনিক জীবনে ভিন্ন ব্যঞ্জনা আনে। পোষাকে, খাবারে, গল্পে আপ্যায়নে দেশী সংস্কৃতি চলে আসে, হয় পারস্পারিক যোগাযোগ। প্রতিটি সমাজেই কিছু বলার মত গল্প থাকে, অন্যদের দেখানোর মত নিজস্ব কিছু সংস্কৃতি থাকে, প্রযন্ম থেকে প্রযন্মে কিছু সুখস্মৃতির সৃস্টির আনন্দ অন্যরকম। তাই ঈদ হোক বা পুজো হোক, কমিউনিটি হল ভাড়া করে বাজার বসে। পুজোর মত দেয়ালীও বড় বর্নাঢ্য। এবারে কানাডার গণ্যমান্যদের সাথে পার্লিয়ামেন্ট হিলে বিভিন্ন রাজপ্রতিনিধি এমনকি প্রধান মন্ত্রী ট্রুডোও অংশ গ্রহণ করেন দেয়ালীর সেই ঝল মলে অনুষ্ঠানে।

 

২৯শে অক্টোবর চিল CBET এর Fund rising dinner. স্বেচ্ছাশ্রমে পরিচালিত এ প্রতিষ্ঠান অটোয়া ও বাংলাদেশে শিক্ষায় অর্থনৈতিক সংকট বা প্রতিকূল অবস্থায় মেধাবী ছাত্র ছাত্রিদের বৃত্তি সহায়তা দেয়। প্রায় ‘শ দুয়েক পাঁচ মিশালী গন্যমান্য  গুন গ্রাহী, নির্বাচিত রাজপ্রতিনিধির সামনে আমন্ত্রিত অতিথি বক্তার চমৎকার বক্তব্য মাননীয় অতিথিবৃন্দ প্রায় বিশ হাজার ডলার দান করলেন। উল্লেখযোগ্য অতিথি বক্তা নিজেই দুই হাজার ডলারের বেশি এ মহৎ কাজে দান করেছেন। স্বেচ্ছাশ্রমে অবদান রাখার জন্য দুজন বাংলাদেশী এবং দুজন ক্যানাডিয়ানকে সার্টিফিকেট দেয়া হয়।

 

দিন খুব দ্রুত ছোট হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির খুব কাছেই গ্রীন জোন। স্ট্রবেরী, ভুট্টা, সয়াবীনের ফসল ছাটা বিরান ভূমিতে ঝাঁকে ঝাঁকে হাঁস শীতের আগেই নিরাপদ উষ্ণতায় যাবার পথে ক্ষনিকের যাত্রা বিরতিতে আতিথ্য গ্রহণ করে। প্রভাতে বা গোধূলির সোনা রঙ্গে উড়ে যাওয়া হাঁসেরা মনকে উড়িয়ে নিয়ে যায়।

 

 

Facebook Comments