নারী প্রসঙ্গ, আসমা খান, About Women, Asma Khan

166

নারী প্রসঙ্গ, আসমা খান, About Women, Asma Khan

সেই আদ্যিকাল থেকেই বিশ্বাস পুত্র সন্তানে বংশ রক্ষা হয়। তাই পুত্র জন্মালে সোনার চামচে মধু না হোলেও জাঁকালো উৎসবতো করাই হয়। বংশ রক্ষার আবদারে দেশে এখনো গ্রামে গঞ্জে হর হামেসা তালাকের হুংকার আর তারপর নুতন করে কবুল/কাবিনের, খোর্মা মিষ্টির হুল্লোড় শোনা যায়। নারী ঘটিত ব্যাপার মিমাংসার জন্য দেন দরবার হয়, গ্রাম্য সালিশিতে হৃদয় বিদারক দৃশ্য নিরুপায়েই মহিলারা সহ্য করে এই ইদানিংকালেও।

আধুনিক সভ্যতার দুর্গ বিলেতে যখন প্রথম পা ফেলি, রানী এলিজাবেথ প্রাসাদে, আর প্রধান মন্ত্রী ম্যাগী থ্যাচার লৌহ সাড়াশিতে দি গ্রেট বৃটেন শাষন করছিলেন। তখন বৃটিশ সাম্রাজ্য সুর্য্য অস্ত গেলেও মরা হাতী লাখ টাকা প্রমান করে ছেড়েছিলেন ফকল্যাণ্ড ওয়ারে। সাম্রাজ্যর খাস তালুকে মহা ধুমধামে যুবরাজ চার্লসের বিয়ের পর রূপকথাটি ফুরালো আর নটে গাছটা কেমন করে পাতা মুড়ালো সারা বিশ্ব বুক ভাঙ্গা কষ্টে টিভিতে  তাকিয়ে দেখেছিল। দিনের পর দিন ভাবনায় হানা দিয়েছিল প্রিন্সেস ডায়ানার নিদারুন যন্ত্রনা কাতর হতাশ অবয়ব।

আর কানাডাতে যখন প্রথম আসি, টেলিফোন কোম্পানি ‘বেল’ ছিল এক দম পকেট কাটা ডাকাত। অটোয়া থেকে অরলিন্সে ফোন করলে সেটাও লং ডিসটেন্স কল। মাসিক ফোন বিল পাঠাতো নির্দয় ভাবে।  অকস্মাৎ এক মাঝ রাতে ফোন এসেছিল তাও ‘কালেক্টর কল’, অরলিন্সের এক ডিটেনশন সেন্টার থেকে। আমার স্বামী কলটা নিয়েছিলেন। ওমা! ফোন করেছিলেন তাঁর অফিসের এক ইঞ্জিনীয়ার কলিগ, একই টীমে কাজ করতেন। সেদিন সন্ধ্যায় বউ পেটানোর দায়ে পুলিশ তাঁকে আটক করেছে। অতি ভদ্র তিনি সত্যি কি বউ পিটিয়েছিলেন? তিনি শপথ করে বলে ছিলেন তিনি কক্ষনো বউ এর গায়ে হাত তোলেননি। তাহলে কি হয়েছিল? ব্যাপারটা হয়েছিল কি, তিনি ছয় মাস আগে বিয়ে করেছিলেন স্বদেশে গিয়ে এবং বাসর রাতে পরের সকালে স্থানীয় প্রচলিত প্রথায় বউ কুমারী ছিল কিনা যে মেয়েলি পরীক্ষায় হয়, সেটায় পাস করতে পারেনি বউ।  সে যাহোক  অটোয়া আসার পর এ অহেতুক সন্দেহ নিয়ে প্রায়ই কথা কাটা কাটি হতো তাদের, এবং নিরাপরাধ বউ এ পরবাসে একাকী অসহায় হয়ে যেত। সেদিন সেটা মাত্রা ছাড়িয়েছিল, বউ তাই পুলিশে ফোন করে নিজে শেল্টারে আশ্রয় নিয়েছিল। ভাগ্যিস অসহায় মেয়েদের জন্য শেল্টার আছে এদেশে।

পুরো দুনিয়ার সব সমাজ জুড়েই লিঙ্গ বৈষম্যর এবং ক্ষমতার ভারসাম্য হীনতার তীব্র গভীর ক্ষত মেয়েদের ধৈর্য্য, মানিয়ে নেয়ার মহত্ব দিয়ে মুড়ে দেয়া হয়। তাদের বোঝানো হয় এ বৈষম্য সহ্য করা মানে তাদের তীর্থ যাত্রা শেষের প্রশান্তি। মহৎ বা সন্মানিত হওয়ার উপলব্ধি! মহিলারা প্রান্তিক চরিত্র হিসেবেই সমাজে চিহ্নিত সেই আদি কাল থেকেই। যদিও সভ্যতা ধাঁই ধাঁই করে শিখর স্পর্শী সময়ের সাথে সাথে। প্রগতি গতি এনেছে যোগাযোগে, জগৎ হয়েছে মুঠো বন্দি। ঘর ছেড়ে আধুনিক মহিলারা দলে দলে পুরুষের পাশা পাশি কর্ম ক্ষেত্র ছয়লাব করলেও মাত্র জনা কয়েক প্রতিভাবান অসম্ভব মানসিক শক্তির জোড়ে  উচ্চতম অফিসে লিঙ্গ বৈষম্য/ ক্ষমতার ভারসাম্য ঘোচাতে পারলেও আমজনতার সেই সমাজ ব্যবস্থা মোটা মুটি অপরিবর্তিতই আছে আধা শতকের ওপার আর এপারে। অর্থাৎ স্বামীর পে-চেকে ঘর বন্দি নারী ঘরের চৌকাঠ ডিঙিয়ে আয় উপার্জন করলেও সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির হেরফের হয়েছে কতটা? তদুপরি সারা দুনিয়ায় মহিলারা নারীত্বের সন্মান প্রাণপণে রক্ষা করে। ইচ্ছের বিরুদ্ধে যদি কেউ তাকে ভোগ করে বা ব্যাবহার করে ফায়দা তোলে নিজের কাছেই সে হেরে যায়। আর এ সমস্ত ক্ষেত্রে দোষ যারই হোক সমাজ তর্জনি তোলে মেয়ের দিকে। তাই কুখ্যাত, অপমানিত, একঘরে হওয়ার চাইতে গ্লানী অন্তর্দহনের তীব্র অনুশোচনা বিপন্ন করে ফেললেও ঘটনা চেপে সম্মান রাখাই বুঝি মঙ্গল।

এ অসম অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রতিবাদ যে কোন ব্যবস্থায় বাঁক বদলের প্রধান শর্ত। প্রতিবাদের জন্য প্লাটফর্ম দরকার, সাহস দরকার, কৌশল দরকার, আর দরকার ইচ্ছুক মানুষ। ক্ষেত্র তৈরীই ছিল, আধুনিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন # Me Too অথবা Times Up  ভাইরাল হয়ে গেল, তখন আন্দোলনে নীরবতা ভেঙ্গে দলে দলে বিপন্ন দশার, ভোগান্তির চিত্র, বা কথা মালা নিয়ে সরব হলেন বৈষম্যর শিকার  নিরুপায় নারী সমাজ। প্রতারিত হওয়ার অসহায় অনুভুতির জর্জরিত অন্তর্দহন প্রকাশ করার কারন পরিস্থিতির সচ্ছতা, সমাজের দৃষ্টি ভঙ্গির পরিবর্তনের আশা। কারো নৈতিক পদস্খলনের শিকার হয়ে অপর জনের জীবনে মানসিক ভাবে কতটা খেসারত দিতে হয়, সেটা সম্পর্কে সমাজকে সচেতন করা। ব্যক্তিগত ভাবে একা একা তাদের যে স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা নেই তাই সমবেত চেষ্টায় আন্দোলনে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলের এই উদ্যোগকে আন্তরিক স্বাগত জানায় গন মাধ্যম। নির্লজ্জ পক্ষপাতিত্ব আর নির্মম উপেক্ষা এই দুই এর মাঝে ক্ষমতার ভারসাম্য হীনতা্র ধুষর এলাকায় প্রত্যকের সচেতন আচরনই সমাজ বদলের পুর্ব শর্ত।

সেই কোন প্রাচীন অন্ধকার বুনো যুগে যাযাবর অশিক্ষিত আরব জাতী যখন সদ্য জাত শিশু কন্যাকে জ্যান্ত কবর দিত, তখন আমাদের নবী মহম্মদ (দঃ) মেয়েদের অনন্য মর্যাদার মুকুট পড়িয়ে ছিলেন।  অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, অধিকার হীনতা থেকেই কিন্ত আসে বৈষম্য। নবী মুহাম্মদ দঃ পারিবারিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে ছেলের আধা হলেও (সেই আধা সম্পত্তিও আজ প্রায় চৌদ্দ শত বছর পড়েও পরিবারের কয়টা মেয়ে পায়?) কিন্ত মেয়েদের পারিবারিক সম্পত্তির অংশীদার করে ক্ষ্মমতার আসন পোক্ত করেছিলেন। বিয়ের পর মেয়েদের আর্থিক নিরাপত্তার স্বীকৃতি স্বরুপ ‘দেনমোহর’ প্রচলন করেছিলেন। বিয়ের পুর্ব শর্ত পাত্রীর ‘এজিন’ বা ‘সন্মতি’ সামনে রেখেছিলেন। এবং মেয়েদেরও ‘তালাক’ দেয়ার অধিকার, এবং বিয়ে ভাঙ্গার পর বা বিধবা হবার পর পুনরায় বিয়ের অধিকারও কেড়ে নেয় নি ইসলাম ধর্ম। সবচেয়ে বড় কথা মায়ের পায়ের নীচে সন্তানের বেহেশত নির্ধারিত করে নারী সমাজকে উচ্চ মর্যাদার আসনেই বসিয়ে গেছেন সেই চৌদ্দ শত বছর আগে।

 

 

Facebook Comments