ইমিগ্রান্ট কড়চা,(ফেব্রুয়ারী) – Immigrant Diary, (Winterlude) By Asma Khan

1764

আজ থেকে ঠিক বিশ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যর মরুভূমির চাঁদিফাটা গরম থেকে উত্তরের মেরুভুমি কানাডার হিমশীতল দেশে হিজরত করি। না, মনের এ্যালবামে আঁতিপাঁতি করে খুঁযে পাবো না মরুভূমিতে উটের কাফেলা আর বেদুঈনদের তাবু জীবন দেখার কোন স্মৃতি। আমাদের পনের বছর বসবাসে্র অভিজ্ঞতায় দেখা মধ্যপ্রাচ্য বড় চটকদার,বড় ঐশর্য্যময়। চকচকে বালির নীচে আছে তেল, আধুনিক বিশ্বের চালিকাশক্তি, তার গরমই আলাদা, চোখের সামনেই কেমন করে গড়ে উঠলো এক একটি আধুনিক শহর, নগর, বন্দর, আবাসিক এলাকা। একেবারে নুতন বানানো আলোকিত হাইওয়ে দিয়ে গাড়ি ছোটালে রাস্তার পাসেই চোখে পড়বে বিশাল বিশাল পাইপ লাইন, মরুভূমিতে খানিক পর পর জিরাফের মত তেল তোলার মেশিন পাতাল থেকে তেল তুলছে অবিরাম ।

তো ’৯৬ সালে এই ফেব্রুয়ারীর ভর শীতে যখন অটোয়াতে এলাম এই শ্বেত শুভ্র অলৌকিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যর মোহে পরে গেলাম। এ যেন রূপকথার গল্পের মত। ছেলেবেলায় ভূগোলে পড়েছি তুষারঢাকা উত্তর মেরুতে ইগলুতে বাস করে এস্কিমোরা (এখন ইনুইট হিসেবে পরিচিত)। সময় শুধু সামনে চলে, তাই উটের কাফেলাসহ তাবুবাসী বেদুঈনরা যেমন মধ্যপ্রাচ্যের নাগরীক আয়েসি জীবনে হারিয়ে গেছে, তেমনি আধুনিক এই শহরে সারি সারি ইগলু বা ইগলুবাসী নজরে পড়বেনা এটা জানা কথা।

আমাদের এয়ারপোর্টে আনতে যাওয়া বন্ধু রোদ ঝলমলে ঐ দিনে সাবধান করলেন বাইরের তাপমাত্রা মাইনাস ২৫ ডিগ্রি, খতরনাক ঠান্ডা আর ‘ফ্রস্টবাইটে’র ছবক পেলাম প্রথম দিনেই। জীবনে কোন রকম ঝড় ঝাপটা ছাড়াও মানুষ নিজেকে বদলাতে হয়, নিজস্ব ক্ষুধা, তৃষ্ণা, চিন্তা, ভাবনা, বিশ্বাস, উৎকন্ঠাকে সামলাতে হয়, আর এতো অভিবাসন, নুতন দেশ, নুতন সমাজ, আমাদের দিন রাত, আমাদের জীবনতো বদল হবেই।

সেই প্রথম আগমনের দ্বিতীয় সপ্তাহেই দেখি ছেলেপিলেরা সমানে ‘স্নোবল’ ছোড়াছুরি করছে। গ্রোসারি নিয়ে আসার পথে পিচ্ছিল বরফে পা হড়কে ধপাস করে পড়লাম, আজন্ম সংস্কারের বসে চারিদিকে তাকিয়ে দেখি কেউ দেখলো কিনা, এ বড় লজ্জার ব্যাপার!! আর দেশে ইহা বড় উপভোগ্য দৃশ্য, এমন ঘটনায় আশেপাশের মানুষ হেসে গড়াগড়ি খায়, পাড়ায় সেদিনের মজার খবর হয়ে যায় ‘আরে শুনছো অমুকে আজকা রাস্তায় বোয়াল মাছ ধরছে!’ তো এখানে অন্য পথচারী সস্নেহে আমাকে তুলে জানতে চাইলেন আমি ব্যাথা পেয়েছি কিনা, ছড়ানো ছিটানো জিনিসগুলি গুছিয়ে আমাকে সঙ্গে করে অনেকটা পথ এগিয়ে দিলেন বয়স্কা অচেনা সেই ভিনদেশী পথচারী। ‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁপে’, বিচ্ছু ছেলেপিলেদের কানাডার শীতের ভয় দেখাবো কি, ওরা সিরিয়াস মুখে স্কুলে একটি চ্যাপ্টার টেস্ট না দিলে রেজাল্ট কি হবে বলে দড়াম করে সদর দরজা বন্দ করে হন হন করে হাঁটা দেয় স্কুলে।

পরের বছর ফেব্রুয়ারীর প্রথম উইক এন্ডে ছেলেমেয়েরা নিয়ে গেল অটোয়ার শীত উৎসব দেখাতে। আহা!!আপনারাও নীচের লিংকে গিয়ে দেখুন এদেশে প্রকৃতিকে মানুষ কেমন করে ব্যাবহার করে, শুভ্র বরফের অপুর্ব সুন্দর স্ফটিক ভাস্কর্য, রিডো ক্যানালে পৃথিবীর বৃহত্তম স্কেটিং রিং, শীত কালীন খেলাধুলা, সপরিবারে দেখার মত উৎসব কাহাকে বলে!!! WinterLudeFestival

যদিও প্রিয়জনের কাছ থেকে যে কোন উপহার যেকোন দিনেই পেতে ভালো লাগে, কানাডিয়ান সংস্কৃতি লাল গোলাপ আর চকলেটের প্রসক্রিপসন দিয়েছে ফেব্রুয়ারীর তীব্র শীতে ভ্যালেন্টাইন ডে উদযাপন করতে।

ফেব্রুয়ারী হচ্ছে Black histotry month। মোটা দাগে গায়ের রঙ্গের বিচারে পৃথিবীর মানুষ চার রঙ্গের সাদা, কালো, বাদামী, হলুদ। কানাডাতে আফ্রো-কানাডিয়ানদের অবদানের জন্য এই লিংকে গেলে অনেক কিছু জানা যায়। Multiculturalism

বিভিন্ন ছদ্মবেশে জাতী, ধর্ম, বর্ণ্, ভাষার অজুহাতে সব যুগেই সামাজিক অবিচার হয়েছে। একদিকে ভয়, বিভেদ, ঘৃনা ও সহিংসতার ক্রুর নীতি, অন্যদিকে আশা, সহনশীলতা এবং সমাজের সামস্টিক মঙ্গল। এভাবেই সময়, সভ্যতা এগিয়েছে। পার্থক্য ইদানিংকার সহজলভ্য ইন্টারনেট প্রযুক্তির (ফেসবুক, টিভি) মাধ্যমে দাবানলের মত খবর ছড়িয়ে দেয়া। বিশেষ করে ছেলেপিলেদের মনোঃজগতে যেন ধ্বস নামছে। টেক্সাসের Ahmed Mohammed যে ঘড়িটা বানিয়ে স্কুলে এনেছিলো, দম আটকানো ঘটনা প্রবাহ, ভাগ্যিস শেষমেশ তার পরিনতি অবশ্য ভালো হয়েছিল। ‘কুখ্যাত’ নয় সে রীতিমত ‘বিখ্যাত’ হয়ে গেছে!!!

বিশ বছর আগে আমাদের চিন্তা ছিল বড়জোর ছেলেপিলেরা তাদের শিকড় ভুলে যাবে কিনা। ৯/১১ এর পর থেকে আজতক বিশ্ব জুড়ে ইসলাম ফোবিয়ার যে ঝড়ো বাতাস বইছে মিডিয়ার কল্যাণে তা আমাদের কুঁড়ে কুড়ে খাচ্ছে আমাদের পরের প্রযন্ম কি শুধু মাত্র তাদের নাম, তাদের গায়ের বাদামী রং, তাদের বাপ দাদার ধর্মের জন্য স্কুলে, চাকরিতে, সমাজে অযথা বৈষম্যর শিকার হবে??? এখন আমাদের মনকে আলোড়িত করার মত ঘটনাগুলো যেকোন ইস্যুর ভিতরেই অনায়াসে চলে আসে, অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করে, যখন সময়টা অনেক অনিশ্চিত,জটিল তখন ধৈর্য্য আর প্রজ্ঞাই ভরষা ।

যেদিন মৃত আইলান কুর্দি ভেসে এসেছিল সমস্ত পৃথিবী বুঝি ডুকরে কেঁদেছিল। সিরিয়া শরনার্থী সংকট যে কোন হৃদয়বানের মন ভেঙ্গে যাবার জন্য যথেষ্ট। কানাডা প্রতিশ্রুত পঞ্চাশ হাজারের(বেসরকারি স্পন্সর সহ) পনের হাজার রিফুজি চলে এসেছে এতিমধ্যে। যাদের স্মৃতিতে শুধুই সব হারানোর হাহাকার, যুদ্ধের হিংস্রতা থেকে তাড়া খেয়ে পালানো, অনিশ্চিত ভয়, নুতন এই দেশে সব কিছুই অচেনা, অজানা। এমনকি ভাষাটাও। সহৃদয় সহানুভুতিও তাদের দিন রাত্রিতে কিছুটা হলেও জমাট বাঁধা কস্ট লাঘব করবে। বিভিন্ন অর্গানাইজেশন তাদের পুনর্বাসনে সক্রিয় অংশ নিচ্ছে, ব্যাক্তিগত ভাবে অর্থ, সময়, স্বেচ্ছাশ্রম, সহানুভুতি কোন না কোন ভাবে সকলেরই অংশ নেয়া উচিৎ।

২১ শে ফেব্রুয়ারী ’৫২ বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্ব অনেক বেশী। আর এখন তো ২১ শে ফেব্রুয়ারী হচ্ছে আন্তর্জাতিক মাতৃ-ভাষা দিবস। খোকন সোনা যখন আধো আধো বোলে মাকে প্রশ্ন করে, মা যখন পরম মমতায় তাকে বুঝিয়ে দেয়, আর সোনাপাখী যখন বিজ্ঞের মত মাথা নাড়ে, খুশিতে ডগমগ হয়ে মা স্বপ্ন দেখে ‘আমার খোকা কত্ত বড় হবে’ !! সম্পর্কের এই অনুভবকে অক্ষরে মলাট বন্দি করেই হয়েছে মাতৃভাষা। মানুষের ভিতরের সৌন্দর্য্য, উচ্ছাস তুলে আনতে মা এবং মায়ের ভাষার অবদান সমস্ত শিল্প সাহিত্যে ছড়িয়ে আছে।

ঢাকাতে প্রতিবছরের মত মাস ব্যাপী বইমেলা শুরু হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য সুখবর প্রকাশিত বইএর ইলেক্ট্রনিক সংস্করন বেঙ্গল পাবলিকেসন্স অন-লাইন স্টোর লিংক.  BanglaBoi এখন থেকে বাংলা ই-বই কেনা যাবে। হাতে করেই আস্ত এক লাইব্রেরী নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে, শর্ত সাপেক্ষে পড়া যাবে ইচ্ছে মত যখন তখন, দামেও বেশ সুলভ, কপাল ভালো থাকলে বেশ কিছু বই মুফতে পেতে পারেন। আসুন আমরা মাতৃভাষায় মমতার কথা বলি।

Facebook Comments