ইমিগ্রান্ট কড়চা (অন্য সময়), আসমা খান। Immigrant Diary (Different Time), Asma Khan, Ottawa, Canada

1595

ইমিগ্রান্ট কড়চা (অন্য সময়), আসমা খান।

প্রযুক্তির হাত ধরে আসা সামাজিক জটিলতার যুগ এটা। তায় আমারা আবার অটোয়াতে শিকড়ছাটা ইমিগ্রান্ট! পঞ্চাশের দশকে পড়তে আসা খালুর সাথে আমার জানাশোনা খালাম্মা নিজের স্বজনহীন, নিঃসঙ্গ, অসহায় বার্ধক্যর কথা আগাম  চিন্তা করে তাঁর মেয়েকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘আমি বুড়ো হলে তুমি আমাকে দেখভাল করবে তো?’ মেয়ে পালটা জিজ্ঞেস করে ‘কত বয়স হলে বুড়ো হয়?’ মা উত্তর দেন ‘এই ধর আশি, বিরাশি’। বালিকা বিজ্ঞের মত অংক কষে ধীরেসুস্থে বলে ‘তোমার বয়স যখন আশি আমি তখন ষাট বছরের হবো, কোয়াইট ওল্ড… দেন আই মাইসেলফ নীড সাম হেল্প… ইউ নো?’

দেশে আমাদের প্রতিবেশির দাদার ছিল জমিদারী মেজাজ। দাদী সব বৌদের ট্রনিং দিতেন ‘তাইনে বাংলা ঘর পার হওনের আগেই যেন দালান ঘরে দস্তরখানে খানা তৈয়ার থাকে’। সমস্যা বলে কয়ে আসেনা আসে দৈব দুর্বিপাকের মতই, তাই অসময়ে দাদা যখন বিছানা নিলেন সে জমানায় ঐতিহ্য অনুযায়ি এবং তখন মায়া মহব্বতেরও কমতি ছিলনা, কাজের লোক পাওয়া যেত, ফলে মেজাজি বুড়োর দেখভাল করা সে পরিবারের জন্য তেমন হুজ্জতের হয়নি।

মানুষের জীবন বড় অদ্ভুত। জন্মের পরে শুধু কান্না দিয়েই মাকে শিশু তার প্রয়োজন বোঝাতে পারে। গড়ে ওঠে মায়ার সম্পর্ক। ক্রমে শিশুটি গায়ে-গতরে বড় হয়, শিক্ষায়, অভিজ্ঞতায় প্রসারিত হয়, বার্ধক্যে ফের সংকুচিত হয়ে শিশুর মত অক্ষম, একেবারে এতিম হয়ে যায়। খেয়াল করেছি মানুষ বড় সুবিধাবাদি, গায়ে পড়ে কেউ আর বাড়তি দায়িত্ব কাঁধে নেয়না এখন। আর বুড়োরাও শিশুর মত ভয়ে মোটামুটি মৌলিক চাহিদাগুলিও চাওয়ার সাহসটাকেও নির্বাসনে পাঠায়।

বহুকাল আগে প্রথম যখন উচ্চ শিক্ষার্থী স্বামীর সঙ্গী হয়ে বিলেত যাবার প্রস্ততি নিচ্ছিলাম, ডক্টরেট করা সদ্য বিলেত ফেরত ক্যাম্পাসের প্রতিবেশী আমাদের সাবধান করে দিয়েছিলেন ‘বিলেতে মাগনা কিছু নেই, বুড়োরা ওদেশে বড় নিঃসঙ্গ, একাকিত্ব ঘোচানোর জন্য পয়সা দিয়ে ঘন্টা হিসেবে কাউকে ভাড়া করে কথা বলে। তবে মানুষ বড় আত্বসচেতন, স্বাবলম্বি। দেশে নানা দাদারা যখন সম্পুর্ন পরনির্ভর অবসর যাপন করেন, বিদেশে বৃদ্ধ্ বয়সেও স্বাধীন ভাবে  জীবন উপভোগ করেন’। কানাডা এসে যেটা শিখেছি, ওয়েলফেয়ার স্টেট, এখানে চমৎকার একটা প্রতিষ্ঠানিক সিস্টেম আছে, একেবারে বুড়োরা স্বচ্ছন্দে সে সিস্টেমে ফিট-ইন করতে পারেন, দরকার কিছু আগাম প্লানিং!

কিন্তু… …

প্লান মত যদি সব কিছু হোত, তাহলে এদুনিয়া বেহেস্ত হয়ে যেত। এখানেও মাঝে মাঝে এমন সব ঘটনা ঘটে যা সব ওলট পালট করে দিয়ে যায়। রোজা ঈদের ঝক্কি-ঝামেলা পার করে করে ঠিক পরের শুক্কুরবার বিয়ে খেলাম, ঠিক পরদিন শনিবার snmc এর সিনিওরদের ‘আপার ক্যানাডা ভিলেজ ট্যুরে’ গেলাম শুকনো কাশি নিয়ে। প্রায় ‘শ দুয়েক বছর আগের কানাডার চালচিত্র, পোষাক আশাক, বাড়ি ঘর, ক্ষেত খামার দেখতে বড় ভালো লেগেছে। বড্ড খুশি মনে কিন্তু ভীষন ক্লান্তি নিয়ে বাসায় ফিরি। কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমে তলিয়ে গেলাম। শেষরাতে শ্বাসকষ্ট নিয়ে জেগে বাথরুমে যেতে চাইলাম, স্বামিকে জাগালাম। আমাকে দেখে ভড়কে গেলেন, গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, বমি, ডায়োরিয়া। ছেলে নেই মেয়ে নেই, খালি ঘরে কার কাছে সাহাজ্য চাইবেন, বুদ্ধি করে ৯১১ এ ফোন করে সাহাজ্য চাইলেন।

আলো জ্বালিয়ে বাজনা বাজিয়ে প্যারামেডিক উদ্ধার করতে এলে আমাকে নার্ভাস স্বামি প্রথম প্রশ্ন করলেন ‘হেলথ কার্ড কৈ?’

‘কালো ব্যাগের পকেটে’।

‘কোথায় সেটা? কোন পকেটে?’… …

এমনতর দুর্যোগে হাস্পাতাল বড়ই নির্ভরযোগ্য স্থান। সঠিক চিকিৎসা, সেবা, ডাক্তার, নার্স, ঔষধ,পথ্য, সুষম খাবার, বিশ্রাম। স্ট্রেচারে করে অন্ধকার শেষরাতে প্রায় অচেতন আমি এসেছিলাম ইমার্জেন্সিতে, পাঁচদিন পর যখন হাস্পাতালের গাউন ছেড়ে কাপর চোপর পড়ে বাসায় আসার জন্য তৈরি, মহিলা ডাক্তার এলেন, সপ্রশংস দৃষ্টিতে তাকিয়ে অত্যন্ত খুশি গলায় বললেন, ‘আসমা ইজ ড্যাট ইউ?’ হাসি মুখে আমার প্রেস্ক্রিপসন,অন্যান্য করনীয় বুঝিয়ে দিলেন।

হটাৎ দুর্যোগের পর বাড়ি ফেরা কতটা স্বস্তির ভেবে দেখেছেন? ঈদের ছুটির পর পর ছেলে গিয়েছিল ইয়োরোপ বেড়াতে, সে ঝটিতে ফিরে এসেছে, মেজ মেয়ে ফাইনান্সিয়াল টাইমস নিউ ইয়র্ক এর চাকরী ছেড়ে এম্পায়ার ষ্টেট বিল্ডিং এ নুতন অফিসে যোগ দেবার আগে ছুটে এসেছে, কাজ পাগল স্বামী, মেয়েরা বন্ধু স্বজন এসেছে কত রঙ্গের গোলাপ নিয়ে!! আর আমি শ্বাস-প্রশ্বাসের লড়াই করেছি!

পরিনত বয়সে পরিবারের ভরকেন্দ্র বদলে যায় সন্তানেরা বড় হলে, তারা বাড়ি ছাড়ে, নিজেদেরও শারিরীক, মানষিক সংকটে একাকীত্ব গ্রাস করে। এমন হটাৎ দুর্যোগে জীবন সঙ্গী, তিনি যত বুদ্ধিমান, চৌকস হোন না কেন, ঘটনার আকস্মিক ভয়াবহতায় ‘কমনসেন্স’ আর ‘কমন প্লেসে’ থাকেনা। ফলে একটা উল্লেখযোগ্য সংখ্যার মানুষ বিভিন্ন ভাবে উপেক্ষিত হতে থাকেন, তাঁরা ‘ব্য়স্ক এতিম’ মনে করুন এ লেখা তাদের কষ্ট লাঘবের দোয়া।

এক। হেলথকার্ড, প্রেস্ক্রিপশন, ঔষধের লিস্ট চোখের সামনে রাখা।

দুই। অর্থনৈতিক অবস্থা সন্মন্ধে জ্ঞান রাখা।

তিন। হোম হেল্থকেয়ার এজেন্সির খোঁজ রাখা।

চার। বন্ধু স্বজনদের সাথে যোগাযোগ/নির্ভর করা।

পাঁচ। পুষ্টিকর খাবার ও দৈনিক হাটা, লঘু শারিরীক পরিশ্রমের রুটিন।

জন্ম থেকে মৃত্যু আয়ুষ্কালে জীবনের কক্ষপথে ক্রমাগত সম্পর্কের টানাপোরন ভাঙ্গাগড়ার মধ্য দিয়ে যায়। আমরা যতই আশা করি পারিবারীক বন্ধন অটুট থাকবে, কিন্তু কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নেয়ার বিকল্প আর কিছু নেই। চেনা অচেনা আশে পাশের মানুষের মাঝে মায়া মমতার বীজ বপন করার গুরুত্ব অপরিশিম।

Facebook Comments