পাথরের আত্মকথা – নাঈমা চৌধুরী, Autobiography of a stone By Nayeema Chowdhury,Toronto

1810

পাথরের আত্মকথা – নাঈমা চৌধুরী, Autobiography of a stone By Nayeema Chowdhury,Toronto

আমার জন্ম মেঘালয়ের এক পাহাড়ি ঝরনার কোলে। অনেকদিন থেকেই আমার জন্মের ক্ষণ ঘনিয়ে আসছিল। আমি তখনও মায়েরই অংশ, এই একটুখানি জুড়ে আছি মায়ের সাথে। স্রোতের তোড়ে আমি যখন কেঁপে কেঁপে উঠতাম মা তখন সাহস দিয়ে ফিসফিস করে বলত, ভয় পাস নে বাছা…আমি তো আছি। একদিন এক তীব্র স্রোত আমাকে ছিটকে ফেলল মায়ের কাছ থেকে। কিন্তু বেশি দূরে নিতে পারলো না। আমি পড়লাম মায়েরই কোল ঘেঁষে, স্রোতের অনেকটা আড়ালে। মা আমাকে আগলে রাখল সব বিপদ থেকে। মা-মেয়েতে মহা আনন্দে দিন পার করতে লাগলাম গল্প করে করে। কত গল্প যে জানে মা, কত তার অভিজ্ঞতা! আমি অবাক হয়ে ভাবি, আমার কি কখনও এতকিছু দেখবার বা জানবার সুযোগ হবে? মা হেসে বলত, হবে রে মেয়ে হবে…সবে তো তোর জীবন শুরু। মনে মনে হয়তো ভাবতো, পারলে তোকে সারা জীবন এভাবেই আগলে রাখতাম।

পাহাড়ি দু’টি ছেলে-মেয়ে প্রায়ই আসত ঝরনার কাছে। তারা আমার মায়ের উপর পা ঝুলিয়ে বসত দেখে আমার খুব রাগ হতো। মা বলত, কেন রাগ করিস? ওদের দু’জনের খুব ভালোবাসা, একটু দেখা করতে, কথা বলতে ছুটে আসে এখানে। ধীরে ধীরে আমারও ভালো লেগে গেল ছেলে-মেয়ে দু’টিকে। ছেলেটির গমগমে গলা, মেয়েটির খিলখিল হাসি সব ভালো লাগতে শুরু করল। ছেলেটি বাঁশি বাজাত কি সুন্দর! মেয়েটি গল্প করতে করতে পা দোলাতো আর তার নূপুর রুমঝুম করে বাজত। বেশ লাগতো শুনতে। একদিন ছেলেটি একা এলো, অনেকক্ষণ বসে থাকল তবুও মেয়েটি এলো না। এরপর থেকে প্রতিদিন ছেলেটি একাই আসতো, মেয়েটির পথের পানে চেয়ে থাকতো অপেক্ষার দৃষ্টি মেলে। তার বিষণ্ণতা আমাদেরও বিষণ্ণ করে দিত। একদিন ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এলো মায়ের কাছে। অনেকক্ষণ ধরে সে কাঁদল তারপর সহসা উঠে হাত বাড়ালো আমার দিকে। আমি আঁতকে উঠলাম, আমি? আমি কেন? মাও যেন কিছু বলতে চাইল। কিন্তু ছেলেটা ততক্ষণে প্রচণ্ড আক্রোশে আমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল মায়ের কাছ থেকে অনেক দূরে। পাহাড়ি ঝরনার তীব্র স্রোতে ভেসে যেতে যেতে আমি চিৎকার করে উঠলাম মা…। মায়ের কথা শুনতে পেতাম না আর, তবুও কিছুদিন মাকে দেখতে পেতাম দূর থেকে। তারপর একদিন…আর পেলাম না। স্রোত আমাকে টেনে নিয়ে গেল মায়ের দৃষ্টিসীমার বাইরে।

শুরু হলো আমার একলা পথচলা। স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে পেরিয়ে এলাম কতটা পথ, মায়ের কাছ থেকে কতটা দূর। কে জানে? সামান্য পাথর আমি, সীমিত আমার জানার পরিধি। তবু জীবন চলার পথে কত কিছুই না দেখলাম, কত অভিজ্ঞতাই না হলো! সেই সাথে বদলাতে লাগলো আমার আকৃতি। ধারালো প্রান্তগুলো ধীরে ধীরে মসৃণ হতে থাকলো। চৌকো থেকে গোলাকারে পরিণত হতে থাকলাম আমি। একসময় মন্থর হয়ে এলো আমার চলা। আমি এসে পড়লাম একটি নদীতে যেখানে স্রোত অনেকটাই শান্ত, চারিদিকে পাহাড়ের সারি, আর নদী জুড়ে অনেক অনেক পাথর। কেউ আমারই মতো ছোট, কেউ অনেক বড়। তাদের কাছে শুনলাম জায়গাটির নাম জাফলং। ওরা আরও বলল আমি নাকি এক দেশের সীমানা পেরিয়ে অন্য দেশে চলে এসেছি। অনেকদিন ধরে একসাথে থাকতে থাকতে আমার ভাব হয়ে গেল অনেকের সাথে। তার মধ্যে একজনকে একটু বিশেষ ভালো লেগে গেল। ভাবলাম সুখে দুঃখে ওর সাথেই কাটিয়ে দেব বাকীটা জীবন। হলো না। তার অনেক অহংকার। আমারই মতো পাথর হলেও সে যে অনেক বড়, নীলবর্ণ তার গায়ের রঙ। তার সাথে কি আমার তুলনা চলে? আজ এই এতদিন পেরিয়ে এসে আমি সেই পাহাড়ি ছেলেটার কষ্ট অনুভব করতে পারলাম যেন এবং ক্ষমা করে দিলাম তাকে। সেই পাথর আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল নাকি আমিই ফিরে এসেছিলাম তা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। জীবনই যেখানে বিপন্ন সেখানে সবকিছুই গুরুত্ব হারায়।

হ্যাঁ আমার জীবন আজ বিপন্ন। জাফলং নামের আমার আবাস বদলে গেছে চোখের সা্মনে দিয়েই। শান্ত পাহাড় ঘেরা এই নদীটি, আর নদীর বুক জুড়ে পরে থাকা আমরা পাথরেরা এখন শুধু আর্তনাদ করে চলি বাঁচবার, কিন্তু চারপাশের এত আওয়াজের ভিড়ে কেউ তা শুনতে পায় না। প্রথম প্রথম তবু এত বড় বড় যন্ত্র ছিল না, মানুষেরা নৌকায় করে আমাদের তুলে নিয়ে যেত নদী থেকে। এখন যেন তারা পণ করেছে একটি পাথরকেও আর বাঁচতে দেয়া চলবে না। একদিন আমাকেও তুলে নিয়ে ফেলা হলো পাথরের স্তূপে। কেউ শুনলো না আমার হাহাকার। এত দুঃখের মাঝেও দেখতে পেলাম একটু দূরে বড় একটি যন্ত্রের হা করা মুখের ভেতর ফেলা হচ্ছে বড় বড় পাথরগুলোকে। আর সেই যন্ত্রটি ভেঙে শত টুকরো করে দিচ্ছে তাদের। সেই যে নীলবর্ণের পাথর তাকেও ফেলা হলো সেই যন্ত্রে। ভেঙে চুরমার হয়ে গেল তার অহংকার। এখন সে আমারই মতো, খুব ছোট। অসামান্য থেকে সামান্য আজ সে।

এখানেই শেষ হলো না আমার গল্প। একদিন চাকা লাগানো একটি যানে তোলা হলো আমাকেসহ আরও অনেককে। সেই যানে করে ঝাঁকি খেতে খেতে আমরা চলতে শুরু করলাম কোনো এক অজানার উদ্দেশ্যে। কতজন তো হারিয়ে গেল পথেই। কতকিছু যে দেখতে দেখতে চললাম আমরা। একদিন চোখ ধাধিয়ে ধাঁধিয়ে গেল আলোতে। এত আলো, এত কোলাহল, এত চাকচিক্য আর একই সাথে এত জঞ্জাল জীবনেও দেখিনি আমি। শুনলাম আমরা নাকি ঢাকায় পৌঁছে গেছি। অনেকক্ষণ থেমে থেমে চলার পর আমরা থামলাম। এই জায়গাটায় এত আলো আর কোলাহল নেই। সেই যান আমাদের ফেলে দিয়ে চলে গেল। সকাল হতেই দেখলাম আমরা পড়ে আছি একটি মেঠো পথের পাশে। নদীর ধার ঘেঁষে চলে গেছে সেই পথ। অনেকগুলো লোক ঝাঁকা ভর্তি করে আমাদের তুলে নিয়ে ছড়িয়ে দিল সেই পথে। ভাবলাম জলের জীবন ছেড়ে এবার বুঝি মাটিতেই হবে আমার ঘর। কিন্তু না, একদিন লোহার চাকা লাগানো ভারি একটি হলুদ রঙের যানকে আসতে দেখলাম আমাদের দিকে। সাথীদের কান্না শোনারও সময় পেলাম না তার আগেই সেই ভারি যান আমাকে থেঁতলে দিল মাটির সাথে। সেই চাপ সইতে না পেরে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল আমার সত্ত্বা।

এখনও এভাবেই পড়ে আছি আমি। প্রতিদিন কত লোক চলাচল করে এই পথ দিয়ে, আমাকে পায়ের তলায় পিষ্ট করে কতজন। কেউ ফিরেও তাকায় না একবারের জন্য। না না…একজন তাকিয়ে ছিল ফিরে। একটি মেয়ে ধীর পায়ে চলতে চলতে আমাকে দেখে ফিরে এসেছিল। তার গলায় ঝুলছিল একটি কালো যন্ত্র। এরকম যন্ত্র অনেকের কাছে দেখেছি জাফলং-এ। মেয়েটি যেতে যেতে ফিরে এসে দাঁড়িয়েছিল আমার একদম কাছে। আমার দিকে তাকিয়ে কি যেন ভেবেছিল খানিকক্ষণ তারপর সেই যন্ত্র তাক করেছিল আমার দিকে। আমি শুধু দু’বার ক্লিক ক্লিক এমন একটা শব্দ শুনতে পেয়েছিলাম। কী ভেবেছিল মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে? তার জীবনও কি আমার মতোই দ্বিখণ্ডিত? জানার সুযোগ হয়নি। মেয়েটির দৃষ্টি কেঁড়ে নিয়েছে তখন অন্য কেউ বা অন্য কোনোকিছু।

পথ চলতি লোকের মুখে শুনেছি শহর ঢাকা নাকি বড় হচ্ছে। সেজন্যই তৈরি হচ্ছে এই পথ। আরও শুনেছি আমাদের নাকি পিচ ঢালাই দিয়ে ঢেকে দেয়া হবে। আমাদের উপর দিয়ে চলবে হাজার হাজার যানবাহন, লক্ষ লক্ষ মানুষ। কেউ কি শুনতে পাবে আমার আর্তনাদ? জানি শুনবে না, মানুষের কান্নাই কেউ শুনতে পায় না এ জগতে আর পাথরের কান্না। এরই নাম বুঝি জীবন। স্রোতের টানে বয়ে চলা তারপর একদিন বিলীন হয়ে যাওয়া পথের ধুলোয়। তা সে মানুষই হোক বা পাথর – একদিন সবাই অস্তিত্বহীন।

 

 

 

Facebook Comments