ইমিগ্রান্ট কড়চা,(তীর্থ যাত্রা, উৎসর্গ), আসমা খান, Immigrant Diary (Pilgrimage, Sacrifice)

1291

ইমিগ্রান্ট কড়চা,(তীর্থ যাত্রা, উৎসর্গ),  আসমা খান ;Immigrant Diary (Pilgrimage, Sacrifice)

আমার জন্মের বছর শুনেছি আব্বা দাদীজানকে নিয়ে হজ্বে গেছিলেন। সে আমলে বড় ভয়ংকর দুর্গম কষ্টসাধ্য প্রায় তিন মাসের সেই তীর্থযাত্রা! সামুদ্রিক জাহাজে চট্টগ্রাম, বোম্বাই, এডেন হয়ে জেদ্দা বন্দর। তারপর মরুভূমির জাহাজ ঊটের কাফেলায় মক্কা, মদীনা!! বড় হয়ে আল্লাহর ঘর, পুন্যভূমির বিশদ বর্ণনা শুনতে চাইতাম।

নব্বই এর দশকে যখন আমি নিজে হজ্বে গিয়েছিলাম, মনে হয়েছিল পেট্রোডলারে আধুনিক স্থাপনায় যেন তীর্থভুমিকে অন্যরূপে সাজিয়েছে। জৌলুসের শীতল টাইলসের ফ্লোরে হারিয়ে গেছে সেই ধু ধু বালুকাময় উত্তপ্ত মরুভুমি, দুর্গম সাফা ও মারওয়া পাহাড়, পানির ট্যাপ খুললেই অলৌকিক জমজমের পানি। পৃথিবীর আধুনিক যেকোন মেগাসিটির চেহারা, চরিত্র, বৈশিষ্টর সাথে মক্কা এক কাতারে দাঁড়ালেও পার্থক্যটা হচ্ছে এটা মুসলমানদের পূন্যভূমি, আর এখানকার ভিজিটরগন তীর্থযাত্রি। এখানে তাঁরা আনন্দময় ছুটি কাটাতে আসেন না, আসেন  আত্বশুদ্ধির জন্য, রুপান্তরিত হতে! বাউন্ডারীতে (মিকাত) ঢোকার আগে দুই টুকরো সেলাই ছাড়া সাদা কাপর পড়ে ‘এহরাম’ বাঁধার সাথে সাথে ‘হারাম’ অর্থাৎ নিষিদ্ধ হয়ে যাবে পার্থিব অনেক কিছু,  নর নারীর সম্পর্কের অন্তরঙ্গ আচরন, সৌন্দর্য্য চর্চা, লোভ, মোহ, হিংস্রতা, ঝগড়া বিবাদ, এমনকি মশা বা পিঁপড়াও মারা যাবে না। দলে দলে যখন কাবা ঘর তাওয়াফ করেন তখন অগোচরেই আধ্যাতিক রুপান্তর হয়। দিনে পাঁচবার নামাজ, বছরে একমাস রোজার কৃচ্ছতা ফরজ হলেও হজ্ব কেন সামর্থ্যবানের জন্যও জীবনে মাত্র একবার ফরজ সেটা নিজে গিয়ে উপলব্ধি করেছি।

মানুষ কেন পুণ্যভূমিতে তীর্থ করতে কেন যায়? কেন যায়? স্রষ্টার নৈকট্য লাভের জন্য? পরকালের পূণ্য সঞ্চয়ের জন্য? যাপিত জীবনের গ্লানী মোচনের বা প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য? কাঙ্ক্ষিত প্রায় অসম্ভব পার্থিব কোন কিছু চাওয়ার জন্য? রোগ বালাই থেকে আরোগ্য লাভের জন্য? না নিছক ধর্মীয় রিচুয়াল পালনের জন্য? অথবা একটা স্থান কেন পুণ্যভূমি হয় ঐশ্বরিক কোন নবী পয়গম্বরের আবির্ভাবে, কোন মহা মানব/মানবীর ত্যাগে, বীরত্বে, জ্ঞানে সমকালীন ও অনাগত কালের সভ্যতায় উল্লেখযোগ্য অবদান রাখার জন্য?

মানুষের হাজারটা জাগতিক ইচ্ছের মত মনের অতলে তীর্থযাত্রার মত ইচ্ছেও কিন্তু লুকিয়ে থাকে। স্রস্টার প্রতি আনুগত্যর চুরান্ত প্রমান দিয়েছেন নবী রসুলগন নিজেদের আচরনে ত্যাগ এবং ধৈর্য্য দিয়ে। হযরত ইব্রাহিম (আঃ), নির্বাসিত হযরত হাজেরা (আঃ), শিশু পুত্র ইসমাইল (আঃ) এর ত্যাগের যে কাহিনী আমাদের ধর্ম গ্রন্থে বিধৃত আছে, আজতক মুসলমানেরা হজ্জ্বে গিয়ে সেটাই অনুসরন করছেন।

স্রস্টার নৈকট্য, আধ্ব্যাতিক প্রশান্তি কামনা মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা। এ কারনেই মানুষের অনেক অনেক জাগতিক উইশ লিস্টের সাথে তীর্থ যাত্রারও ইচ্ছে মনে মনে পোষন করে। যদিও সময়ের সাথে সাথে সেই নির্বাসিত নির্জন মরুভুমি এখন ঝকমকে অতি আধুনিক এক শহর, কিন্তু মানুষের আকাংখাটা সেই আদি ও অকৃত্তিম, সেই একই রয়ে গেছে। সে কারনেই ‘লাব্বায়েক আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক’ বলে দুই টুকরো সাদা কাপড়ে নিজেকে আবৃত করে নগ্ন পায়ে হাজির হয় বিনম্র শ্রদ্ধায়। বর্তমানে সারা বিশ্ব থেকে প্রতি বছর প্রায় ত্রিশ লাখ লোক হজ্জ্ব পালন করছেন। অটোয়া থেকে এ বছর অনেকেই হজ্জ্বে গিয়েছেন।

আরাফাতের পরের দিন হাজীরা কোরবানী করেন হজ্জ্বের শর্ত হিসেবে। আর সারা বিশ্বের মুসলমানেরা ঈদ উল আযহা অর্থাৎ ত্যাগের উৎসব উদযাপন করেন। এটা মুসলমানদের ধর্মীয়, সামাজিক উৎসব। ঐতিহ্য হচ্ছে যার যেমন সামর্থ্য গরু, ছাগল, ভেড়া কোরবানী করেন, তিন ভাগের এক ভাগ নিজের, এক ভাগ বন্ধু স্বজনের, আর এক ভাগ গরীব দুঃখীর মাঝে বিলিয়ে দেয়া, অর্থাৎ উৎসবে সমাজের সাম্য ভাবনা। নিছক সামাজিক উৎসবে ঐ সব ভাগ বাটোয়ারার বালাই নেই কিন্তু!!

বিশ বছর আগে যখন অটোয়াতে এসেছি, তখন উইক ডে তে ঈদ হলে উৎসব ঝিমিয়ে যেত, আর কোরবানীর এই ঝক্কি ঝামেলা তো বহুত দূর অস্ত! উইকে এন্ডে কিছু দাওয়াত ফাওয়াত হলে জানা যেত দেশে কোরবানীর টাকা পাঠিয়ে দিয়েছেন কে বা কারা কারা। কিন্তু ব্যাপার হোল,  আমরা এদেশে বসত করার জন্য এসেছি, বেড়াতে আসিনি। আমার স্বামী আবার ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে পছন্দ করেন। ’৯৯ সালে তিনি এক মুসলিম স্লটার হাউজ খুঁজে বের করে বেশ কয়েক বন্ধুকে নিয়ে কোরবানি করেছিলেন। নিজেই দায়িত্ব নিয়ে সকলের মাংস দুরের স্লটার হাউজ থেকে এনে বাড়ী বাড়ী পৌছে দিয়েছিলেন। নিজেদেরটা ফ্রিজে, বন্ধু স্বজনেরা মিলে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে সবাই মিলে রীতিমত হৈ চৈ এর প্টলাক ঈদ রি ইউনিয়ন, আর গরীবের ভাগ তিনি নিজে গিয়ে রিফিউজিদের দিয়ে এসেছিলেন। ঝক্কি ঝামেলার এই বিশাল তুঘলকি কারবার উদ্যেগি হয়ে বিনা মুল্যে স্বেচ্ছাশ্রমে তিনি নিজ কাঁধে নেয়ায় কোরবানী কিন্তু খুব সহজেই পপুলার হয়ে গেল, এথনিক হালাল গ্রসারী দোকান গুলোও এগিয়ে এলো।

১। তিনি অটোয়াতে মুসলমান কমিউনিটিকে সচেতন করলেন ‘আব্রাহাম’স ফেস্টিভ্যালস অফ স্যাক্রিফাইস’ বা কোরবানীর প্রয়োজনীয়তা ও উপকারিতা।

২। ডেবিট, ক্রডিট কার্ড, পেপ্যাল, অন-লাইন বা চেকের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করে নাম ই-মেইল এড্রেস, ফোন নাম্বার সহ কোরবানী বুকিং এর ব্যাবস্থা করা, প্রযুক্তির উপযুক্ত ব্যাবহার করে সম্পুর্ন অলাভজনক জন সেবা, অর্থাৎ ব্যাংক সার্ভিস চার্জও SNMC বহন করে।

৩। অর্গানাজেশনের ঠিকানায় মাংস আসার সাথে সাথে ই-মেইলে সব্বাইকে জানিয়ে দেয়া হয় গরিবের ভাগ রেখে নিজেদের ভাগ নিয়ে যাবার জন্য।

৪। সমোঝোতায় আসলেন স্লটার হাউসের সাথে যেন তারা ফ্রজেন ট্রাকে করে চার/পাঁচটা গরু, বিশ পঁচিশটা ছাগল ভেড়া কেটে কুটে প্রত্যেক ভাগে নাম ঠিকানা সহ সব একই সময়ে ডেলিভারী দেয়। মাংস কাটা ও ডেলিভারি চার্জ যেন তারা বহন করে।

৫। কোরবানীর মাংস ডেলিভারী দেয়ার দুই ঘন্টা পরে যেন অটোয়া ফুড ব্যাংক, সাদাকা ফুড ব্যাংক আসে গরীবের জন্য দানের এক তৃতীয়াংশ টাটকা মাংস সংগ্রহ করতে, সে ব্যাবস্থা করা। শহরে ফুড ব্যাংক নির্ভর কানাডিয়ান(শুধু মুসলমান নয় কিন্তু) দরিদ্র জনগোষ্ঠী যেন উপকৃত হতে পারে। স্বেচ্ছাস্রমে অনেকেই জানাশোনা দরিদ্র বাড়িতে মাংস পৌছে দিতে এগিয়ে আসেন।

৬। ’৯৯ সাল থেকে ’১৪ সাল পর্যন্ত ঐ ট্রাক কোরবানীর মাংস নিয়ে SNMC এর অস্থায়ী ঠিকানা আমাদের বাসায় আসতো। ’১৫ সাল থেকে 3020 Woodroff Ave এ স্থায়ী ঠিকানায় স্থানান্তরিত হয়েছে।

৭। কানাডার মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এবারের ঈদের নামাজে অটোয়ার মেইন মসজিদে এসেছিলেন। ধর্মীয় সামাজিক উৎসবে তাঁর এই ক্ষনিক উপস্থিতি মুসলমান সম্প্রদায়কে  স্বীকৃতি দিলেন, গৌরাবান্বিত করলেন।

প্রিয় বস্তুকে উৎসর্গ করা ঈদ উল আযহার মূল সুর। একবিংশ শতকে আমাদের সবচেয়ে প্রিয় কি? ইচ্ছে মতন পয়সা খরচ এবং সময় কাটানো। স্ত্রীকে নির্বাসনে পাঠাতে, সন্তানকে বিপথগামী করতে আজকাল আর নির্জন মরুভূমি লাগে না, ইন্টারনেট, স্মার্টফোনই যথেস্ট। হজরত হাজেরা (আঃ) সাফা এবং মারওয়া পাহাড়ের চূড়ায় উঠে সাহায্যর সন্ধান যেমন করেছেন তেমনি সমতলে শায়িত পুত্রের খেয়ালও করেছেন। পাহাড়ের পাদদেশে নেমেই ছুটেছেন পুত্রের কাছে। ঠিক তেমনি আমার মনে হয় এখন মায়েদের বা বাবাদের উচিৎ রুজি রোজগার আর বিনোদনের মাঝে ব্যালান্স করে সন্তানদের সময় দেয়া। তাদের শিক্ষায় বিনিয়োগ করা, তারা যেন এ যুগের মরীচিকায় না পড়ে মরুদ্দ্যানের অংশ হতে পারে।

Facebook Comments