মাতৃভাষা ‘বাংলা’… … ভিন্ন স্বদেশ, মাঝের সম্ভাবনা Mother Tongue- Bangla- Foreign Land – Possibilities In Between Asma Khan

1277

মাতৃভাষা ‘বাংলা’… … ভিন্ন স্বদেশ, মাঝের সম্ভাবনা,  Mother Tongue- Bangla-  Foreign Land – Possibilities  In Between Asma Khan

সে বহু আগের স্কুল বেলার কথা, তবে পুর্ব পাকিস্তানে সে সময়টা ছিল, ‘বিস্ফোরণের কাল’। ’৭১ সালে সমগ্র অধিবাসীরা  গর্জে উঠেছিল।  রক্ত ক্ষয়ী যুদ্ধে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে ছিল ‘বাংলাদেশ’ নামের স্বাধীন দেশের।

সেই স্বাধীন বাংলাদেশের পাসপোর্টে উচ্চ শিক্ষার্থী স্বামীর সাথে প্রথমে বিলেত ও পরে বাহরায়েনে বসবাস। বৃটিশ প্রাইভেট স্কুলে মেয়েকে ভর্তি করাতে গিয়ে শুনি খোদ বৃটেনের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, বাচনভঙ্গী অটুট রাখার জন্য কোন বিশ জনের ক্লাসেই পাঁচ জনের বেশি ভিন দেশি নেয়া হবে না। এমন কি দোআঁশলা (বৃটিশ এবং ভিন দেশী মিক্স বিয়ের ফসল ) বাচ্চা ও এই অনুপাত ভাংতে পারবে না। আহা!!সারা বিশ্বের বনেদী ভাষা বলে কথা!

তো আজকে লিখতে বসে ভাষার গোঁজামিল ধাঁধায় ফেলে দিল। ধাঁধাটি হচ্ছে, এই যে আমরা প্রায় পনেরো বছর বাহরায়েনে আরবদের সাথেই কাটিয়ে এলাম, প্রতি দিন ধর্মীয় গ্রন্থ কোরান শরিফ পড়ি, কিন্ত আরবী ভাষা কি আমার দখলে আছে? নেই। একদা ছেলে মেয়ের উপর অযথা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম বাংলা পড়িয়ে। তারা পড়তে লিখতে বলতে পারলেও ‘বুঝতে’ পারছে না তো বিষয়টা! ঠিক আমাদের কোরান শরিফ পড়ার মত! সে যাহোক, ছেলে মেয়েরা বাংলা একটি বিষয় হিসেবে ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা দিয়ে সফল হয়েছে ঘরে পড়েই। মনের গহিনে তো আমাদের জানাই ছিল, ‘এক্সপার্ট্রিয়েট’, কন্ট্রাক্ট রিনিউ না হলে বাহরায়েন ছাড়তেই হবে। তাই ভাসমান জীবনে শিকড় কিছুটা শিথিল হলেও জন্মভূমির সাথেই নোঙ্গর করা ছিল।

অথচ চাকরির কন্ট্রাক্টের মাঝ পথেই জৌলুসের আর আয়েশের জীবন ছেড়ে অনিশ্চয়তার পথে যখন কানাডায় এসেছিলাম ছেলেমেয়ের শিক্ষার জন্যই। কিন্ত এটাও সত্য কানাডাতে জনম জনম ধরে বসবাস করার জন্যই আসা হয়েছে। পরিচয় নেওয়া হয়েছে। পাস পোর্ট করা হয়েছে এবং এই কানাডিয়ান পাসপোর্ট সকলেই যক্ষের ধনের মত আগলে রাখে স্থানীয় ব্যাংকের সেফটি ডেপোজিট বক্সে! বাড়ি ঘর কিনে, চাকরি, ব্যাংক একাউন্টে রাস্তা ঘাটে দোকান পাটে কানাডিয়ান পরিচয়েই পরিচিত। কিন্তু একান্তে নিজেই নিজেকে শিকড় ছেড়া এক অতলান্ত হাহাকারে প্রশ্ন করি, কে তুমি? কি তোমার বর্ণ, ধর্ম? তোমার ভাষিক পরিচয় কি? ঠিক এই স্বকিয়তা বা নিজস্বতার এবং আত্ব-পরিচিতির এই তাগিদেই SNMC এর চ্যারিটি পাবার পর ফি শনিবারে স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের দশ/বারোটি ক্লাস রুম ভাড়া নিয়ে বিভিন্ন আরব ও দক্ষিন পুর্ব এশিয়ার বাচ্চাদের মাতৃ ভাষা, যেমন বাংলা, আরবি, উর্দু, সোমালি শেখানোর স্কুল খুলেছিলেন, আমার স্বামী যা আজও সাফল্যর সাথে চলছে।

এবছর থেকে অটোয়াতে ২১ শে ফেব্রুয়ারী আন্তর্জাতিক মাতৃ ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পেল। এ উপলক্ষে বাংলা ভাষা ও দেশকে অনায়াসে এখনকার শিক্ষাঙ্গনে পরিচিত করা সম্ভব। লাইব্রেরীতে বইমেলা হতে পারে। গত পাঁচ বছর ধরে প্রতি মাসে দোভাষি ম্যাগাজিন কানাডিয়ান ড্রিমে অটোয়ার হাল চাল ফুটে উঠছে। রজারস’ টিভিতে মাসে মাসে  দেখাচ্ছে বাঙ্গালাদেশী চাল চিত্র। ফ্যামিলি ডে তে উইন্টারল্যুডে গিয়ে উৎসবের মাঝে গরম গরম ‘বিভার টেল’, খেতে খেতে ছেলে পিলে দের ‘বাখর খানি পরাটার’ গল্প করা যেতে পারে, ঠিক যেমন গত পিঠে উৎসবে স্পিচ কম্পিটিশনে প্রথম প্রাইজ জিতে নিয়েছিল ‘ম্যাপল সিরাপ বনাম খেজুরের রস’! প্রাইজ জিতেছিল বাংলাদেশের ‘সংসদ ভবন বনাম কানাডার পার্লিয়ামেন্ট’, বাংলাদেশের ‘স্বাধীনতা দিবস বনাম কানাডার স্বাধীনতা দিবস’! মাতৃ ভাষায় দেশী আড্ডায়ও যোগাযোগে স্থানীয় বিষয় আলোচনা জমে ভালো।। ফেব্রুয়ারীতে  অটোয়াতে যখন সফেদ সৌন্দর্য উজার করে দিচ্ছে কন কনে শীতের ন্যাড়া প্রকৃতি, ঠিক তখন ফুলেল বসন্তের গান শুধু বেমানান নয়, দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে সেটা বিভ্রান্তি কর।

ডায়াস্পোরা প্রজন্ম গভীর ভাবে কানেক্টেড প্রযুক্তির সাথে। মুঠো ফোন বিশ্বকে করতলে এনে দিয়েছে, পরস্পরকে এ ফোন যেমন কানেক্ট করতে পারে তেমনি বিচ্ছিন্নও করতে পারে, শুধু তাই নয় এ যেন শেখা আর বিনোদনের অফুরন্ত উৎস। সৃজনশীল শিল্প প্রকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। বিশ্বায়নের যুগে ইন্টারনেটেই অনায়াসে তারা তাবত আত্বিয় স্বজনকেই তাক লাগিয়ে দিতে পারবে সৃজনশীল ফটো ডাইরি, ইউটিউবে, ব্যানার সহ নিউজ লেটারে ই-কার্ডে, ঈদের ‘ইট-মোবারক’ জম্পেস উতসব ডকুমেন্টারীতে! ছেলে পিলের সৃজনশীলতা বরাবরের মত এখনও আছে, দরকার উত্সাহ দিয়ে উদ্ভুদ্ধ করা। যেমন ভাবে আমাদের সময়ে সুতোর কাজ বা উলের কাজ বা ক্রুশ কাটার নুতন ডিজাইন শিখতে হুমরি খেয়ে পড়তাম। ঠিক তেমনি এই প্রজন্ম ইন্টারনেট প্লাটফর্মে তাদের সৃজনশীলতা খোদাই করতে পারে।  আত্ব প্রকাশের আকাংখা আদি ও অকৃত্রিম, শুধু মাধ্যম বদলে যায় সময় আর স্থানের সাথে সাথে।

আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের বাংলা আজকের বাংলার মত ছিল না, দশ বছর বাদেও এমন থাকবে না। বদলাবে, যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে স্থান, কাল ও পাত্রের মত বদল হবে, তবে একটা অন্তরস্থ পারিবারিক বৈশিষ্ট স্বকিয়তা জীবন বোধ বা স্পিরিচুয়ালিটি থাকবে প্রজন্মের ধারাবাহিকতায়। থাকবে বাংলা বর্ণমালাও, যদি আমরা এটাকে পরিচর্যা করি। পারিবার ও চেনা পাড়া থেকে দরকার উৎসাহ আর অনুপ্রেরনা। ভাষার মাসে অটোয়াতে তরুন প্রজন্মের কাছে ইন্টারনেট আর বাংলাদেশীদের অন্যরকম সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখতেই পারি!

 

Facebook Comments