ইমিগ্রান্ট কড়চা, আসমা খান: Immigrant Diary (CBET), Asma Khan, Ottawa

620

ইমিগ্রান্ট কড়চা (CBET), আসমা খান Immigrant Diary (CBET), Asma Khan

স্কুলে আমাদের পন্ডিত স্যার বাংলা ও ইতিহাস পড়াতেন। এক ইতিহাস ক্লাসে পড়িয়েছিলেন সুতানুটি, কলিকাটি আর গোবিন্দপুর নামে সাপ খোপে ভরা ঘোর জঙ্গল কেটে কোলকাতা মহানগরের পত্তন করেছিল বৃটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। গল্পের ছলে স্যার আমাদের আরো শুনিয়ে ছিলেন দাগী আসামিদের শাস্তির জন্য নির্বাসনে পাঠানো হতো অস্ট্রেলিয়াতে, সেখানেও স্থানীয়দের সাথে লড়াই করেই সাদা মানুষেরা চোখ ধাঁধানো আধুনিক নগর বন্দর সভ্যতার একটা সিস্টেম ম্যানেজমেন্ট দাড় করিয়ে উন্নতির শিখরে উঠেছে। সে ক্লাসে স্যার খানিক আক্ষেপের স্বরে কতকটা ভবিষ্যৎ বানীর মতই বলেছিলেন, ’আর বাঙ্গালীরা বিলেত অস্ট্রেলিয়া গেলেও নিজ পাড়াতে বাংলাদেশের মত অরাজক উশৃংখল জনপদ বানিয়ে ছাড়বে’। উচ্চ শিক্ষার জন্য এবং বিশ্বায়নের ফলে হরেদরে গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশীরা দেশ ছাড়ছেন, বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকত্ব নিচ্ছেন, মেধার সাক্ষর রাখছেন। নিজস্ব পাড়া গড়েছেন এবং সে সব পাড়ার এজমালি উঠোনে প্রায়ই দেশজঃ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদি যেমন হচ্ছে তেমনি অরাজক কুটকাচালি সভ্যতার মাত্রাও ছাড়াচ্ছে!

যে দেশেই বসত করা হোক না কেন জীবনের উন্নতি করতে হলে উচ্চ শিক্ষার বিকল্প আর কিছু নেই। খোদ অটোয়াতে হাই স্কুল ফ্রি হলেও ভার্সিটি শিক্ষায় গুচ্ছের খরচ। টিউশন ফি, বই কেনা, বাস পাস, এসবের জন্য মেধাবীদের বিভিন্ন একাডেমিক স্কলারশিপ, বারসারী, স্টুডেন্টস লোন, পার্ট টাইম চাকরি বা অন্যান্য সহায়তা থাকলেও ছাত্রদের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ যেন পিছু লেগেই থাকে। তাদের জন্য এক কালিন একটা স্কলারশিপ নিঃসন্দেহে স্বস্তি ও ভালো প্রাপ্তি। আর বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিকে বোর্ডের পরীক্ষার ফর্ম পুরন করার সময় যে এক কালিন নগদ টাকার কাফফারা যা অনেক পরিবারেই কুলিয়ে উঠতে পারেনা, ফলে হর হামেশা কত মেধাবী অকালেই ঝরে যায়। ঠিক একই রকমের ধাক্কা আসে ভার্সিটি ভর্তির সময়ও।

অটোয়াতে বাংলাদেশিদের সামাজিকতা হচ্ছে ফি সপ্তাহে দাওয়াত খাওয়া বা খাওয়ানো। সে সব মজলিশে কান পাতলে শোনা যায় প্রায় সকলেই স্বদেশে নিজ নিজ স্বজনদের, চেনা জানাদের পড়ার খরচ দিচ্ছেন। অথচ কানাডার যে কোন রেজিস্টার্ড চ্যারিটিতে যে কেউ দান করলে তাঁকে ট্যাক্স রিসিট দেয়া হয় এবং বছর শেষে দাতা তাঁর ট্যাক্স রিটার্নের সময় সরকার তাঁদের দানকে উৎসাহিত করার জন্য, দানের ৩০% অর্থ দাতাকে ফেরত দেয়।   ’১২ সালে অটোয়াতে প্রথমে নন-প্রফিট এবং ’১৪ সালে CBET চ্যারিটি স্ট্যাটাস পায়। তো এ প্রতিষ্ঠানের (WWW.CBET.ca) বৈশিষ্ট কি? এর বৈশিষ্ট হচ্ছে সরকার স্বীকৃত সততা ও আস্থার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো, সচ্ছ অর্থনৈতিক হিসাব, এবং জবাবদিহিতা। ডোনেশন সংগ্রহ, স্কলারশিপ বিতরনের যাবতীয় কাজ সম্পুর্ন স্বেচ্ছা শ্রমে কতিপয় বোর্ড মেম্বার নিরলস করে চলেছেন। দান সে যত ছোটই হোক না কেন, একটা জীবন বদলের জন্য তা অনেক গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ। অন্যান্য রেজিষ্টার্ড চ্যারিটির মত CBET ও জনগণের কাছে ডোনেশন সংগ্রহ করে, ট্যাক্স রিসিট দেয়। প্রাপ্ত অর্থ অটোয়ায় প্রতি বছরের মত এ বছরও পাঁচ শত ডলার করে পাঁচটা স্কলারশিপ হাইস্কুলে, সাত শত ডলারের একটি আল গনকুইন কলেজে, এবং এক হাজার ডলার করে অটোয়া এবং কার্ল্টন এ দুই ভার্সিটিতে দুইটা স্কলারশিপ দিয়েছে। ’১৪ সাল থেকে আজ তক বাংলাদেশে বিভিন্ন কলেজে, প্রতিটি কলেজে পাঁচটি করে এ পর্যন্ত দশ হাজার টাকা করে মোট প্রায় সাত শত স্কলারশিপ দেয়া হয়েছে।

শুরুতেই CBET:

১।   বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজে বৃত্তি বিতরনের জন্য অত্যান্ত নির্ভর যোগ্য NGO ‘সুরভি’র সাথে চুক্তি স্বাক্ষরিত করেছ। বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন পাবার পর অটোয়ার CBET ব্যাংক একাউন্ট থেকে সরাসরি বাংলাদেশের সুরভীর বাংক একাউন্টে ডলার পাঠানো হয়।

২। বাংলাদেশের বিভিন্ন কলেজের প্রিন্সিপাল পাঁচ সদস্যর কমিটি, আট/দশ জন ছাত্র ছাত্রটিকে মনোনয়ন করে অটোয়াতে পাঠান।

৩। অটোয়া অফিসে্র স্কলারশিপ কমিটি সেই লিস্ট থেকে কলেজ প্রতি, পাঁচ জনকে বৃত্তি দেবার জন্য মনোনীত করে সুরভীকে জানানো হয়।

৪। সুরভী অটোয়ার নির্দেশ মোতাবেক প্রতিটি কলেজের সেই সব মনোনীত ছাত্র ছাত্রীর নামে চেক লিখে কলেজ প্রিন্সিপালের ঠিকানায় পাঠায়।

৫। বাংলাদেশে বিভিন্ন জেলায় কলেজের প্রিন্সিপাল বৃত্তি বিতরন অনুষ্ঠানে সফল ছাত্র ছাত্রীকে বৃত্তির চেক হস্তান্তর করেন। ছবি, নাম, ধাম পাঠান।

এ বছর অদ্ভুতুরে এক সময়ের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে CBET. প্রায় একুশ বছর আগে অটোয়াতে যখন এসেছিলাম, যাদের সাথে হরদম ওঠাবসা ছিল, তাঁদের এখন জীবনে ভাটির টান। প্রথম প্রযন্মের ইমিগ্রান্ট, দেশের প্রতি তীব্র টান থাকা, স্বেচ্ছাশ্রমে দেশের জন্য কিছু করা ছিল স্বাভাবিক। সময়ের সাথে সাথে এখন সবচেয়ে উগ্র ্বাংলাদেশ প্রেমিকদের (যাঁরা ভিন দেশীদের সাথে সন্তানের বৈবাহিক সম্পর্কের নামেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠতেন) তাঁদের ঘরেও দোঁআশলা নাতীপুতি চাঁদের হাট বসিয়েছে। এই সব আগামী প্রযন্মের সামনে চিৎ হয়ে উপরের দিকে থুতু ফেললে নিজের গায়েই পড়বে সেটা। ফেসবুকের কল্যানে অনেকেই সমাজে নেতৃত্বের মসনদে আসীন, পরবাসী সমাজে স্বঘোষিত খান্দানি উজির নাজিরের মান সন্মান কুট কাচালিতে ধুলায় লুটিয়ে দেন। কিন্ত পরবাসে বসে বাংলাদেশের রাজনীতি ছাড়াও দেশ ও জন সেবা করা সম্ভব। সেদিক দিয়ে CBET জন্মভুমি আর বাসভুমির মধ্য সেতু গড়ে আমাদের পুর্ব প্রযন্মের সাথে উত্তর প্রযন্মের যোগাযোগের ব্যাবস্থা করেছে। আমরা নিজ ঠিকানা থেকে যে পরহিতকর্ম শুরু করেছিলাম, সেটা কোন পুরষ্কারের পাবার আশায়ও নয়, তিরস্কারের ধাক্কা সামলানোর জন্যও নয়, বরং স্বেচ্ছাশ্রমে স্বদেশের কিছু অভাবী মেধাবীদের দিন বদলের জন্য কাজটা করা প্রয়োজন, আর তাদের সম্ভাবনাময় ভবিষ্যতের জন্য।

Facebook Comments