শতাব্দীর ঝড়, আসমা খান, Storm of the Century, Asma Khan, Ottawa

582

শতাব্দীর ঝড়, আসমা খান, Tornado of the Century, Asma Khan, Ottawa

‘মনসুন’ এর দেশের মেয়ে, আর আমাদের দেশের বছরের শুরুই তো হয় কালবৈশেখীর ঝড় তুফান দিয়ে! সব দেশেই কম বেশী ঝড় বন্যা, ভুমিকম্প, অগ্নুৎপাত, বুনো আগুন, তুষার ঝড় মায় সুনামি এর মতন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষের জীবনকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। যে কোন দুর্যোগ স্থানীয় বা আন্তর্জাতিক মনোযোগে চলে আসে ক্ষয় ক্ষতির ব্যাপকতায় সেটা ‘খবর’ হিসেবে মানুষের মনকে আপ্লুত করে তৎক্ষণাৎ অথবা দিন কতক, তারপর যে যার দিন যাপনে অভ্যস্ত হয়ে যায়। কিছু কিছু দুর্যোগ বছরের পর বছর মানুষ মনে রাখে, শতাব্দীর সেরা ঘটনার মত সেরা দুর্ঘটনাও মানুষ স্মরণ করে অনন্য কিছু বৈশিষ্ট্যর জন্য। কিছু অবিশ্বাস্য মিরাকেলের জন্য। দয়াময় প্রকৃতিতে মানুষ অভ্যস্ত, তার রুক্ষ, ভয়ংকর ধ্বংসের সামনে মুখোমুখি মানুষ একান্তই অসহায়। কিন্ত কোন অলৌকিক উপায়ে মানুষ আত্বরক্ষা করে, তছনছ করে দেয়া সব কিছু আবার ফের শুরু করে জীবন। জীবন বড় মুল্যবান!!

১৯৬৯ সালের ১২ই নভেম্বর তদানিন্তন পুর্ব পাকিস্তানে ঘুর্নি ঝড় ও সামদ্রিক জলোৎচ্ছাস শতাব্দীর ভয়াবহ দুর্যোগ হিসেবে আমাদের মনে বিশাল ক্ষতের মত দাগ কেটে আছে। জান মালের এমন ভয়াবহ ক্ষতি মানুষকে চমকে দিয়েছিল। তখন সমুদ্র উপকূলের ছোট মাঝারী দ্বীপেও মোটা মুটি ঘন জন বসতি ছিল। আম জনতাকে সচেতন করার জন্য দুর্গম দ্বীপে বিপদ সংকেত পাঠানোর তেমন কোন জোড়ালো মাধ্যমও ছিল না কতৃপক্ষের তেমন গড়জও না। ফলে অরক্ষিত অসহায় দ্বীপবাসী ভয়ঙ্কর ঝড়ের মোকাবেলায় ভাগ্যকেই মেনে নিতে অভ্যস্ত ছিল। তীব্র ভয়াবহ ক্ষয় ক্ষতির মধ্যে অলৌকিক ভাবেই কারো কারো বেঁচে যাওয়াকে মিরাকেল মনে করা হতো। কিন্ত কিছু লোকের উদ্যম, দুরদর্শিতা, কৌশল মানুষ মনে রাখে দৃষ্টান্ত হিসেবে। আমার স্কুলবেলায় শোনা সেই সত্য ঘটনা আজো আমাকে অনুপ্রানিত করে। এক সমৃদ্ধ গৃহস্ত পরিবারে তিন কিশোর সন্তান, তাদে্র মা দুর্যোগের দিন হটাৎ খেয়াল করেছিলেন পুকুর উপচিয়ে পানি উঠোনের দিকে তির তির করে এগিয়ে আসছে। আঞ্চলিক ভাষায় সম্ভবত একে ‘গোর্কি’ বলে। মুহুর্তে স্বামী সন্তান নিয়ে তিনি কাজে ঝাপিয়ে পড়েছিলেন। গরু ছাগলের দড়ি  খুলে, হাঁস মুরগী ছেড়ে দিয়ে, অতি দ্রুত শাবল কোদাল কুড়াল দা বটি পুকুরে ছুড়ে ফেলে বড় বড় খালি ডেকচি বালতির সাথে সাথে চাল ভর্তি একটি মটকাও পুকুরে ডুবিয়ে দিয়ে, একটি মুড়ির টিন ও এক কলসি পানি এবং দড়ির গোছা নিয়ে মিনিট কয়েকের মধ্য যখন বাগানে এসে দাড়িয়েছেন পানি তখন কোমর ছুঁই ছুঁই করছে। ঠাণ্ডা মাথায় তিন সন্তানকে তিন বিশাল গাছের উঁচু মজবুত কান্ডের সাথে দড়ি দিয়ে বেঁধে নিজেরাও ভিন্ন ভিন্ন গাছের উঁচু কান্ডে বেঁধে নিয়ে কায়মনে দোয়ায় আল্লাহর উপর ভরষা করেছিলেন।

ঝড় কিছুটা নিস্তেজ হোলে শোকর করেছিলেন পাঁচটি গাছে সপরিবারে বেঁচে যাবার জন্য। গাছের নীচে যত দূর দৃষ্টি যায় অথৈ ঘোলাটে পানি থৈ থৈ করছে ঘর বাড়ি লোকালয়ের কোন চিহ্ন নেই। যে উচ্ছাসে স্রোত দ্বীপ গ্রাস করেছিল, বলা যায়  ঝড়ের শেষে একই গতিতে পানির স্রোত নিম্নগামী সমুদ্রমুখী হয়ে ছিল। ভয়াবহ জলোচ্ছাস আর ঘুর্নিঝড়ের ধ্বংশের বা ক্ষয় ক্ষতির চিত্র সর্বত্র এক। কিন্ত যেটা উল্লেখযোগ্য সপরিবারে সেই পরিবার দ্রুত নিম্নগামী স্রোতে ভাঙ্গা গাছ, ডালপালার বাঁধা সরিয়ে হাজারে হাজারে মৃত গরু, মহিষ, মানুষের লাস ভাসিয়ে দিয়ে পরিবেশকে দূষণ মুক্ত, অনেক সহনীয় করেছিলেন। দেখা দেখি অন্যরা ও হাত লাগিয়ে কাজ সহজ করেছিল। ক্রমশ জীবিতরা খোঁজ খবরে জানাজানি হয়েছিল কোন পরিবারই অক্ষত ছিল না। কত কত পরিবার একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। পুরো দ্বীপ যেন এক সমতল ভুমি, ঘর বাড়ির কোন চিহ্ন ছিলনা, ছিল না বসত বাড়ির ঠিকানা। নিজেদের বেঁচে যাওয়া একট মুরগী একটু উঁচু মাটির ঢিবির আশে পাশে ঘুর ঘুর করতে দেখে নিজেদের অস্তিত্বের স্থান চিনতে পেরেছিলেন। সাধারণত এমন সব প্রাকৃতিক দুর্যোগের পর পরই ধেঁয়ে আসে রোগ বালাই। শোকাহত দ্বীপবাসী আত্বরক্ষায় অবিশ্বাস্য দক্ষতার পরিচয় ছিল সেখানেও। পুকুরেরে পানিতে ডুবিয়ে দেয়া কোদাল, কুড়াল, হাড়ি বালতি এমনকি সেই মটকা ভর্তি ভেজা চাল, পানি থেকে তুলে এনে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ডাব, নারকেলের পানিতে সমবেত ভাবে আত্বরক্ষা করে কৌশলে ফের জীবন শুরুর সফল চেষ্টা করেছিলেন। বেশ বিলম্বে হলেও ত্রান নিয়ে যখন কর্মীরা সে দ্বীপে উপস্থিত হয়েছিলেন নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারেননি দ্বীপবাসীর অবিশ্বাস্য দ্রুত পুনর্বাশনে।

৬৯ এর শতাব্দীর সেই ঘুর্নিঝড় ও সামদ্রিক জলোৎচ্ছাস বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ ভাবে স্মরণীয় কারন তদানিন্তন পাকিস্তান সরকার পুরো দূর্যোগকে অত্যন্ত হেলাফেলায় ঢামাচাপা দিতে চেয়েছিল, প্রাপ্য মনোযোগ দিতে অস্বীকার করার শোকাহত মানুষের আত্ব মর্যদায় আঘাতে নিজেরা স্ব-মহিমায় জেগে উঠেছিল টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া একই পাটাতনে দাঁড়িয়ে ৭০ এর নির্বাচনে বাংলাদেশের নিরঙ্কুশ বিজয় এনেছিল।

 

টিভিতে টর্নেডোর দৃশ্য বড়ই আজব মনে হতে পারে, যেখানে পাখ-পাখালীর মত গাছ পালা, দেয়াল ছাদ, গাড়ি, তো বটেই এমন কি জ্যান্ত বিশাল গরু বা কুকুরও আকাশে উড়ে চলে যাচ্ছে খানিক তফাতে দাঁড়িয়ে হা করে এ তাজ্জবের দৃশ্য দেখছে যারা তাদের কিছুই হয়নি!! কিছুক্ষনের মধ্য যেখানে আঘাত করে ঘুর্নায়মান পথে সব কিছু চুরমার করে দিয়ে যায়। ১৮৯৮ সালে ২৬ শে সেপ্টেম্বর অন্টারিও, কানাডার সেন্ট ক্যাথারিনে শেষ শতাব্দীর ঝড় পাঁচ মানুষের জীবন হরন করেছিল, আহত করেছিল ডজন খানেক। সেই ক্ষয় ক্ষতির কথা নাহয় আজকের মত তোলা থাক! আজ বরং ২১ শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ সালের অটোয়ার ঝড়ের কথা হোক। হটাৎ করেই অটোয়াতে একসাথে টিভি, কম্পিউটার, সেলফোনে টর্নেডো এলার্ট করলো। জানালার বাইরে ঝুম বৃষ্টি আর তীব্র বাতাসের মাতামাতি। দুম করে পাওয়ার চলে গেল। অটোয়ার ঝকমকে নাগরিক সংস্কৃতির মেরুদন্ড হচ্ছে ইলেক্ট্রেসিটি, ইন্টারনেট। পাওয়ার নেই তো সব অচল, একেবারেই অচল! আরে দূর অচল বললেই হোল? রাস্তায় গাড়ি তো চলছে! জানালার বাইরে তাকিয়ে তুমুল বৃষ্টিতে দেখি পলকের জন্য বেঁচে গেল চলন্ত এক গাড়ি, হটাৎ বিশাল এক গাছের ডাল উড়ে এসে গাড়ির সামনে ধাম করে পড়লো। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষনে ড্রাইভার, কেউ কি এমনতর মুহুর্তের নিখুঁত বর্ননা দিতে পারে? টর্নেডোর ঐ খতরনাক চেহারা জীবন্ত জাহান্নাম পার হয়ে নিরাপদে ফিরে আসা! যদি না ফেরা হোত?

সন্ধ্যায় HCI এর Fund rising dinner. ঝড়ের দাপট  থেমে যাওয়ায় আমরা অন্ধকারেই তৈরী হয়ে পথে নেমে দেখি ট্রাফিক লাইট/স্ট্রিট লাইট সব অকেজো। রাস্তায় অফিস ফেরত ঘরমূখী মানষের ঢল। কিন্ত অত্যন্ত সচেতন ড্রাইভিং এ, রাস্তায় অন্য ড্রাইভারদের সহযোগিতায়, বড় জাংশানেও সুশৃঙ্খল নিয়ম অনুসরণে খানিক বিলম্বে গন্তব্য গিয়ে শুনি দুর্যোগের কারনে প্রোগ্রাম ক্যান্সেল। ফিরতি পথে পথ চলতি গাড়ির হেডলাইটে অতটা না বুঝলেও বাসায় এসে আঁধারের স্বরূপ বুঝতে পারলাম। পাওয়ার নেই অফিস, দোকান সব বন্দ, ঘরের চুলো জ্বলবে না, অনেকেরই কাঁচা বাজার মুলতবি থাকে শনি রবিবারের জন্য। ফলে ঘরে তৈরী খাবার নেই, প্রবীন এবং বাচ্চা কাচ্চাদের তো মহা ঝামেলা! আমি খান সাহেবকে বলি SNMC এর রান্নাঘরে গ্যাসের চুলায় অন্ততঃ চালে ডালে খিচুড়ি রান্নাকরে আশে পাশের প্রবীণ পরিবারদের দেয়ার জন্য। কিন্ত তিনি আমাকে বললেন এদেশে নিরাপত্তা সবচেয়ে বিবেচ্য, যেহেতু বিল্ডিঙে পাওয়ার নেই, সেহেতু সেখানে চুলা জ্বালানো ঠিক হবে না। সে যাহোক শহরের বিভিন্ন স্থানে আশ্রয় কেন্দ্র, বিভিন্ন স্থানে খাবার, বারবিকিউ বার্গার, চা কফি ফ্রি বিলি করা হতে লাগলো। প্রায় পঞ্চান্ন ঘন্টার পর বাসার পাওয়ার ফিরে এলে এবং ইন্টারনেট ফিরে আসায় জানাজানি হলো দুর্গত এলাকার হাল-হকিকত! কালাবগী, গ্যাটিনো, বারহেভেনে মারমুখী টর্নেডো ছোবল মেরেছে। বারহেভেনের আরলিংটন উডে বিশাল এক পাইন গাছ উপরে ফেলেছে, আর আশেপাশের গাছের ডালপালা ভেঙ্গে বা বাড়ি ঘরের ছাল-চামড়া ছিলে জানালা দরজা, ছাঁদ উড়িয়ে চমৎকার এলাকাটাকে ছন্নছাড়া বেহাল দশায় রেখে গেছে।

ঝকমকে নগর অটোয়াতে এই খতরনাক টর্নেডো ১৩০ টির বেশী বাড়ি ধ্বংশ করেছে, শতাব্দী পুরোনো গাছপালা তছনছ করে এলাকাকে ছাড়খার করে, ৯০টার বেশী ইলেক্ট্রিক পোল উপড়িয়ে ফেলে ১৮০,০০০ টির মত হাইড্রো খদ্দেরকে নিকষ আঁধারে ডুবিয়ে চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে সন্দেহ নেই। কিন্ত শতাব্দীর এহেন ক্ষয় ক্ষতির ঝড়ে উল্লেখযোগ্যঃ

১। জনগনকে আগাম খবরে সচেতন করা গেছে।

২। দুর্গত এলাকার কাউন্সিলর, এমপি, মিনিস্টার জনগনের পাশে এসে দাড়িয়েছেন, খাবার, আশ্রয়ের ব্যাবস্থাপনায় সক্রিয় অংশ নিয়ে জন-প্রতিনীধি হিসেবে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখেছেন।

৩। রেজিস্টার্ড চ্যারিটি রেড ক্রস, ইউনাইটেড ওয়ে, বিভিন্ন চার্চ, বিভিন্ন মসজিদঃ SNMC, KMA, OMA, AMA, এবং GATINEAU সাহায্যর দরদী হাত বাড়িয়ে দি্যেছিল।

৩। অধিবাসীরা প্রযুক্তি আসক্ত সংস্কৃতি ভুলে কত সহজেই ভার্চুয়াল জগৎ মুঠোফোন থেকে মুখ তুলে আর্ত-জনের যেকোন সেবায় স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসলো। নগর জুড়ে বেশ কিছু শেল্টার খোলার পরও যাদের বাড়িতে ইলেক্ট্রেসিটি ছিল, জাত ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দুর্গত আগান্তুকদের স্বাগত জানিয়েছেন আশ্রয়ের, খাবার, গেজেট চার্জ, বা গোসলের জন্য।

৪। ১৮০,০০০ টি অন্ধকার স্থাপনায় দ্রুত আলোকিত করার ক্রমাগত নিরলস প্রচেষ্টার জন্য হাইড্রো অটোয়ার বীর প্রকৌশলী ও কর্মচারিবৃন্দ শ্রদ্ধেয় অভিবাদনের দাবীদার। প্যারামেডিক এবং ফায়ার বিগ্রেড অসম্ভব দক্ষতায় সামাল দিয়েছেন অন্ধকার দুর্গত শহর ব্যাস্থপনায়। সশ্রদ্ধ অভিবাদনের পাওনাদার তাঁরাও।

প্রকৃতি শৃংখলা মেনে চলে। তো রাজধানী অটোয়ার আকাশে বিশৃংখল তিনটি টর্নেডো অতর্কিতে এক মাসের বরাদ্দ বৃষ্টি এক ঘন্টায় ঢেলে দিয়ে সাথে পৃথিবীর সর্বচ্চো গতির বাতাস, ক্ষয় ক্ষতি যা হবার তা তো হয়েছে, কিন্ত অলৌকিক দিক হোল একটি মানুষও জানে মারা পড়েনি, আমরা সবাই বড় বাঁচা বেঁচে গিয়েছি!!!

শোকর আলহামদুলিল্লাহ!!!

 

Facebook Comments