তাওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য (পর্ব-২): মোসলেম উদ্দীনআমি তো গুনাহ করি না তবে তওবা ইস্তেগফার করব কেনা? We did not do any sin, why should we ask forgiveness, Moslem Uddin, Ottawa

771

তাওবা ও ইস্তেগফারের পার্থক্য (পর্ব-২): মোসলেম উদ্দীন

আমি তো গুনাহ করি না তবে তওবা  ইস্তেগফার  করব কেনা?

আমাদের ধারণা শুধু গুনাহ করলে তওবা ইস্তেগফার করতে হয় এবং গুনাহ না করলে তওবা ইস্তেগফার করার দরকার নেই।  এমন ধারণা ভুল। নেক কাজ করার পরও তওবা  ইস্তেগফার করা দরকার। কারন এর ভিতর হয়ত কোনো ভুল ত্রূটি থাকতে পারে।হয়ত কাজের শুরুতে খারাপ নিয়ত থাকতে অথবা আরও অনেকে ত্রূটি থাকতে পারে যা আমরা জানি না। এ জন্য আল্লাহর কাছে চেয়ে নেওয়া যাতে আল্লাহ আমাদেরকে মাফ করে দেন এবং দুনিয়া আখেরাতে আমাদের কল্যান দান করেন। আল্লাহ তায়ালা তওবা কারীদের অত্যন্ত ভালবাসেন।তওবা আল্লাহ এবং আল্লাহর রসূলের প্রতি আনুগত্যের প্রকাশ  ঘটায়। অপরদিকে তওবাহীনতা অন্তরকে কঠিন করে তোলে, অন্তরে অহংকারের বীজ বপন করে ও শয়তানের অনুসরনে উদ্বুদ্ধ করে।  তওবার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে নিজের অসহায়ত্ব প্রকাশ করা হয়। বেশি বেশি তওবা করার দ্বারা আল্লাহতায়ালা খুশি হন। তওবার দ্বারা আল্লাহর কাছে মানুষের দাসত্ব ও অসহায়ত্ব প্রকাশ পায়।

তওবকারীকে আল্লাহ সুবহানুহুতায়া’লা চার প্রকার সম্মান করেন। যথা-

১। আল্লাহতায়া’লা তওবাকারীকে পাপ থেকে এমন ভাবে পবিত্র করেন যেন সে কখনও পাপ করেই নাই।

২। আল্লাহপাক তওবাকারীকে ভাল বাসতে থাকেন।

৩। শয়তান থেকে তাকে হেফাজতে রাখেন।

৪। দুনিয়া পরিত্যাগ করার পূর্বে তাকে নির্ভয় এবং নিশ্চিন্ত করে দেন।

সুতরাং, বুঝা যায় যে গুনাহ করি বা না করি, তওবা করা অতি  জরুরী।

তওবা কখন করবআমাদের দেশে ফাঁসির আসামীর মৃত্যুদন্ড কার্যকরের আগে মৌলভী ডেকে অজু করিয়ে তওবা পড়ান হয়। আমার  মুমূর্ষু রোগীকে বারবার জোর করে তওবা করার তাগিদ দেওয়া হয়।  এতে স্বাভাবিকভাবে সাধারণ মানুষের মনে ভয় ঢুকে যায় তওবা করা মানে তাকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তত হবে বা শীঘ্রই তিনি মারা যাবেন। তার এবং মৃত্যুর মাঝে বাঁধা তওবা। তওবা করা মানে নির্ঘাত মৃত্যু। আবার অনেকে মনে করে  একবার  তওবা  করা মানে পুরাপুরি হুজুর হয়ে যাওয়া।

সারা জীবনের একবারও কোন খারাপ কাজ করা যাবে না।  সে মনে করে সে এখন তওবার জন্য প্রস্তত না। তাই মনে করে মৃত্যুর আগে আগে পূর্ণ তওবা করে নেবে। তখন আর খারাপ কাজ করার সুযোগ থাকবে না। তওবা সমন্ধে সুস্পষ্ট  ধারণা থাকায় তওবার উত্তম নেয়ামত ও সুযোগকে গ্রহণ করি না।

তওবা যেকোনো সময় করা যায়।  কোনো গুনাহ হয়ে থাকলে সঙ্গে সঙ্গে তওবা এস্তেগফার করতে হবে। পরে করব বলে ফেলে রাখলে, শয়তান তওবা করার কথা ভুলিয়ে দেবে। বারবার ভুল হয়ে থাকলে বারবার তওবা করা যায়। এমন না যে  একবার তওবা করলে দ্বিতীয়বার তওবা করা যাবে না। আল্লাহ এমন দয়ালু যে তিনি এ সুযোগটি আমাদের জন্য মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দিয়ে রেখেছেন। প্রতিদিন অসংখ্যবার তওবা করা যায়। কোনো সীমাবদ্ধতা নেই।  রাসুল্লাহ সাঃ প্রতিদিন সত্তর বারের ও বেশি তওবা ইস্তেগফার পড়তেন। প্রতিটি ফরজ নামাজের পর তওবা ইস্তেগফার করার সুন্নাত।  এটা আমাদের অভ্যাসে পরিণত করা উচিত।

তওবা করতে কি অজু লাগবেতওবার সঙ্গে আন্তরিক অনুতাপ অনুশোচনার সম্পর্ক। অজুর সাথে সম্পর্ক নয়। তওবার সাথে অন্যের সহযোগিতারও সম্পর্ক নেই। তবে সবসময় অজুর সঙ্গে থাকা ভাল ও তওবার নামাজ পড়তে হলে অজু লাগবে। অজু ছাড়া নামাজ হয় না। অজু নেই বা কাপড় পাক নেই বলে তওবা করতে বিলম্ব করা উচিত না।

তাওবা-ইস্তেগফার এর জন্য কী কী দুয়া রয়েছেহাদিসে বর্ণিত তাওবা ও ইস্তেগফার এর কতিপয় দোয়া প্রদান করা হল

দোয়া-১:

মূল আরবীঃ أَستَغْفِرُ اللهَ

উচ্চারণঃ  আস্তাগফিরুল্লা-হ।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

প্রতি ওয়াক্তের ফরয সালাতে সালাম ফিরানোর পর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এই দোয়া ৩ বার পড়তেন। [মিশকাত-৯৬১]

 

দোয়া-২:

মূল আরবীঃ أَسْتَغْفِرُ اللهَ وَأَتُوْبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণঃ আস্তাগফিরুল্লা-হা ওয়া আতূবু ইলাইহি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি ও তাঁর দিকে ফিরে আসছি।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) প্রতিদিন ৭০ বারের অধিক তাওবা ও ইসতিগফার করতেন। [বুখারী-৬৩০৭]

 

দোয়া-৩:

মূল আরবীঃ  أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ الَّذِي لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ

উচ্চারণঃ আস্‌তাগফিরুল্লা-হাল্লাযী লা- ইলা-হা ইল্লা- হুওয়াল হাইয়্যুল কইয়্যূম ওয়া আতূবু ইলায়হি।

অনুবাদঃ আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাই, তিনি ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন মা‘বূদ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী এবং তাঁর কাছে তাওবাহ্ করি।

এই দোয়া পড়লে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন-যদিও সে যুদ্ধক্ষেত্র হতে পলায়নকারী হয়। [আবু দাউদ-১৫১৭, তিরমিযী-৩৫৭৭, মিশকাত-২৩৫৩]

দোয়া-৪:

মূল আরবীঃ رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَتُبْ عَلَيَّ إِنَّكَ (أنْتَ) التَّوَّابُ الرَّحِيْمُ / الغَفُوْرُ

উচ্চারণঃ রাব্বিগ্ ফিরলী, ওয়া তুব ‘আলাইয়্যা, ইন্নাকা আনতাত তাওয়া-বুর রাহীম। দ্বিতীয় বর্ণনয় “রাহীম”-এর বদলে: ‘গাফূর’।

অনুবাদঃ হে আমার প্রভু, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমার তাওবা কবুল করুন। নিশ্চয় আপনি মহান তাওবা কবুলকারী করুণাময়। দ্বিতীয় বর্ণনায়: তাওবা কবুলকারী ও ক্ষমাকারী।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মসজিদে বসে এক বৈঠকেই এই দোয়া ১০০ বার পড়েছেন। [আবূ দাঊদ-১৫১৬, ইবনু মাজাহ-৩৮১৪, তিরমিযী-৩৪৩৪, মিশকাত-২৩৫২]

 

দোয়া-৫: (সাইয়েদুল ইস্তিগফার-বা আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার শ্রেষ্ঠ দুআ:

মূল আরবীঃ اللَّهُمَّ أَنْتَ رَبِّي لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ خَلَقْتَنِي وَأَنَا عَبْدُكَ وَأَنَا عَلَى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ أَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ أَبُوءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ وَأَبُوءُ لَكَ بِذَنْبِي فَاغْفِرْ لِي فَإِنَّهُ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلَّا أَنْتَ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আনতা রব্বী লা-ইলাহা ইল্লা আনতা খালাক্কতানী ওয়া আনা আ’বদুকা ওয়া আনা আ’লা আহ্দিকা ওয়া ও’য়াদিকা মাসতাত’তু আ’উযুবিকা মিন শার্রি মা ছা’নাতু আবূউলাকা বিনি’মাতিকা আ’লাইয়্যা ওয়া আবূউলাকা বিযানবী ফাগ্ফির্লী ফাইন্নাহু লা-ইয়াগফিরুয্যুনূবা ইল্লা আনতা

অনুবাদঃ হে আল্লাহ তুমিই আমার প্রতিপালক। তুমি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। তুমিই আমাকে সৃষ্টি করেছ। আমি তোমারই গোলাম। আমি যথাসাধ্য তোমার সঙ্গে প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকারের উপর আছি। আমি আমার সব কৃতকর্মের কুফল থেকে তোমার কাছে পানাহ চাচ্ছি। তুমি আমার প্রতি তোমার যে নিয়ামত দিয়েছ তা স্বীকার করছি। আর আমার কৃত গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। তুমি আমাকে মাফ করে দাও। কারন তুমি ছাড়া কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারবে না।

এই দোয়া সকালে পড়ে রাতের আগে মারা গেলে অথবা রাতে পড়ে সকালের আগে মারা গেলে সে জান্নাতে যাবে। [বুখারী-৬৩০৬]

এ সকল দুয়া ছাড়াও কুরআন ও হাদীসে আল্লাহর তাআলা নিকট ক্ষমা প্রার্থনার আরও বিভিন্ন দুয়া বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো পড়ার চেষ্টা করতে হবে। এমনকি নিজের ভাষায় নিজের মত করে মহান আল্লাহর নিকট নিজের অপরাধগুলো তুলে ধরে ক্ষমা প্রার্থনা করলেও তিনি ক্ষমা করবেন ইনশাআল্লাহ।

Facebook Comments