অর্গান ডোনেশন: আমার ভাবনা – নাঈমা চৌধুরী Organ Donation: My Two Cents  By Nayeema Chowdhury 

751

অর্গান ডোনেশন: আমার ভাবনা – নাঈমা চৌধুরী Organ Donation: My Two Cents 

By Nayeema Chowdhury 

সেদিন একটা নিউজ পোর্টালে ওকলাহোমার এক মায়ের কথা পড়লাম, যে প্রেগন্যান্সির ১৯ সপ্তাহে আল্ট্রাসাউন্ড থেকে জানতে পারে তার অনাগত সন্তানটির একটি বিরল ত্রুটি রয়েছে। Anencephaly নামের এই ত্রুটি নিয়ে যারা জন্মায় তাদের ব্রেন ও স্কালের কিছু অংশ থাকে না। এর কোনো চিকিৎসাও নেই বলে এদের আয়ু খুবই সাময়িক। এমন খবরে যে কোনো মায়েরই ভীষণভাবে ভেঙে পড়ার কথা সেও তার ব্যতিক্রম নয়, কিন্তু এর মাঝেও এই মা একটি অসাধারণ সিদ্ধান্ত নেয়। তার কাছে মনে হয় অবশ্যই অনাগত এই জীবনের একটি উদ্দেশ্য আছে। সে তার সন্তানটিকে পূর্ণ সময় পার করে জন্ম দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় যাতে তার অর্গানগুলো ডোনেট করা সম্ভব হয়। তার স্বামীও তার এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানায়। তারা তাদের এই অনাগত তৃতীয় সন্তানের নাম রাখে Annie যার অর্থ grace. মাত্র ১৪ ঘন্টা বেঁচে ছিল অ্যানি, তবু এই ছোট্ট জীবনে সে বাঁচিয়ে গিয়েছিল আরো অনেকগুলো প্রাণ।

কিছু খবর পড়লে স্তব্ধ হয়ে যেতে হয়, এটাও আমার কাছে তেমন একটি খবর ছিল। ভাবতে পারেন কতখানি সাহসী এবং মানবিক হলে একজন মা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিতে পারে? এমন মানবিকতার গল্প এটাই প্রথম নয়। মুভিও কম বানানো হয়নি এই বিষয়ে। এই মুহূর্তে  ‘সেভেন পাউন্ডস’ নামে একটা মুভির কথা মনে পড়ছে যে মুভির নায়ক তার অতীত জীবনের একটি অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে সাতজন মানুষকে খুঁজে বের করে যাদের অর্গান ট্রান্সপ্লান্টের প্রয়োজন রয়েছে এবং একজন অ্যাটর্নির সহায়তায় তার অর্গানগুলো ঐ সাতজন মানুষকে উইল করে দিয়ে আত্মহত্যা করে। মুভির গল্প হিসাবে চমকপ্রদ হলেও বাস্তবে অর্গান উইল করে দিয়ে যাবার মতো কোনো নিয়ম নেই। তবে এই মুভিতে অর্গান ট্রান্সপ্লান্টের আশায় মৃত্যুর সাথে লড়তে থাকা মানুষের অসহনীয় জীবনের চিত্র উঠে এসেছিল। গুগল সার্চ দিলে অর্গান ডোনেশনের অনেক হৃদয়স্পর্শী সত্যি কাহিনী পাবেন যা মুভিকেও হার মানাবে। কিন্তু এমন গল্পে মুসলিমদের কমই পাবেন। নিজের জীবন বিপন্ন হলে অন্য কারো অর্গান রিসিভ করতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই কিন্তু ডোনার হতে আপত্তি আছে। কেন? আমার মনেও এই প্রশ্ন জেগেছিল। আর তখনই এ বিষয়ে নিজের ভাবনাগুলো লিখব বলে ঠিক করি।

মৃত্যুর পরের অন্ধকার আবাসের কথা ভাবলে আমার কেমন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে। যদিও জানি তখন নিঃশ্বাস নেয়ার কোনো প্রয়োজনই পড়বে না। মানুষ নিজেকে বোধ হয় সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে তাই মৃত্যুর পর তার এত যত্নে গড়া দেহটা পোকামাকড়ের খাবার হবে তা ভাবতেই পারে না। তার নিস্প্রাণ দেহটাকে কেউ কাটাকুটি করবে তা তো আরো অসম্ভব ব্যাপার। যুক্তিবাদী মানুষের যৌক্তিক মনও তখন কোনো যুক্তি মানতে চায় না। আর তাই মরণোত্তর অর্গান ডোনেশনের কথাও আমরা ভাবতে পারি না। তার ওপর আছে ধর্মীয় বাধা। অর্গান ডোনেশনের ব্যাপারে ইসলাম কি বলে তা নিয়ে মুসলিম স্কলারদের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে। যারা এর বিপক্ষে তাদের যুক্তি হলো ইসলামে মৃতদেহকে খুব যত্নের সাথে নাড়াচাড়া করতে বলা হয়েছে এবং কোনো ধরনের বিকৃতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বাংলাদেশে মরণোত্তর চক্ষুদানের ব্যাপারে ক্যাম্পেইন হতে দেখলেও অর্গান ডোনেশনের ব্যাপারে কোনো ক্যাম্পেইন দেখিনি। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট ছাড়া আর কোনো ট্রান্সপ্লান্টের কথাও কখনও শুনিনি। এ থেকে ধারণা করতে পারি, দেশে মৃত্যুর পর অর্গান ডোনেশন বা ট্রান্সপ্লান্টের মতো স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। শুধু চক্ষুদানের সুযোগ আছে। কিন্তু সেটাই বা আমরা কয়জন ভাবি বা করি? আমিও তেমন ভাবিনি এটা নিয়ে। দুই একবার যখন ভেবেছি তখন চোখ ছাড়া নিজেকে কল্পনা করতে পারিনি, মৃত্যুর পরও। অক্সিজনের অভাব না হলে মানুষ আসলে অক্সিজেনের কথা ভাবে না। চক্ষুস্মান মানুষ ভাবতে পারে না দৃষ্টিহীন একজন মানুষের জীবন কেমন হতে পারে। ভাবতে পারে না একটি প্রত্যঙ্গের অসুস্থতায় বিপন্ন মানবজীবনের কথা।

 

ক্যানাডা আসার পর হেল্থ কার্ডের ফর্ম ভরতে গিয়ে ‘অর্গান ডোনার হতে চাই কি না’ বিষয়ক প্রশ্নটি দেখে তাই আমিও একটু থমকে গিয়েছিলাম। এ ব্যাপারে আমার ভাবনার শুরু সেই থেকে। আমি খুব ধার্মিক মানুষ বলে নিজেকে দাবী করতে পারি না। জীবনে সবসময় সৎ পথে চলার চেষ্টা করেছি, জ্ঞানত কারো ক্ষতি করিনি। কিন্তু এসব তো শুধু ধর্মীয় নয় মানবিক গুণাবলী। ধর্মকর্ম বলতে দায়সারা গোছের নামাজ-রোজা আর নিয়ম মেনে যাকাত দেয়া ছাড়া আর তেমন কোনো পূণ্য করিনি যাতে বেহেস্তের গ্যারান্টি মেলে। সেই আমিও ধর্মের দোহাই দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার দায় এড়িয়ে গেলাম সে যাত্রায়। তাই যদি হয় তাহলে এখন এত কথা কেন বলছি? – এই প্রশ্ন আসতে পারে। সেজন্য বলা প্রয়োজন, আমি শেষ পর্যন্ত আমার অযৌক্তিক মনকে বুঝিয়ে, অহেতুক ভয় কাটিয়ে অর্গান ডোনারের লিস্টে নিজের নাম লিখাতে পেরেছি। আর আমাকে এই সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করেছে স্রষ্টার প্রতি, মানুষের উপরে এক অপার্থিব শক্তির প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস। এ ব্যাপারে আমার ধর্মকেও আমার সপক্ষেই পেয়েছি। আমার মনে হয়েছে, যে আল্লাহ্ তার সৃষ্টিকে এত ভালোবাসেন তার সৃষ্টিকৃত কোনো প্রাণীকে বাঁচাতে আমি যদি সামান্যতম এই কাজটি করি তার জন্য তিনি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না।

 

অর্গান ডোনেশনের সপক্ষে ইসলামী স্কলারদের যুক্তি হলো, মৃতদেহের বিকৃতি বলতে তা ক্ষত-বিক্ষত করা (mutilation) বুঝায় কিন্তু অর্গান ডোনারের দেহ থেকে অর্গান রিমুভ করতে তার দেহকে ক্ষত-বিক্ষত করার মতো ঘটনা ঘটে না তাই এটা নিষিদ্ধ হতে পারে না। তারা আল-কোরআনের যে আয়াতটিকে এ বিষয়ের সবচেয়ে অকাট্য যুক্তি হিসাবে উপস্থাপন করেছেন তা হলো: “Whosoever killeth a human being for other than manslaughter or corruption in the earth, it shall be as if he had killed all mankind, and whoso saveth the life of one, it shall be as if he had saved the life of all mankind.”  (নরহত্যা কিংবা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কাজ করা ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন বিশ্বের সব মানুষকেই হত্যা করল। আর যে কারো প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন (বিশ্বের) সব মানুষের প্রাণ রক্ষা করল – (সুরা মায়েদা : ৩২)। যেখানে একজন মানুষকে বাঁচাবার কথা বলা হয়েছে সেখানে একজন অর্গান ডোনার বাঁচাতে পারেন প্রায় ৮টি জীবন। একথা জানার পর আমার আর কোনো যুক্তির প্রয়োজন পড়েনি।

 

সামান্য ছা পোষা মানুষ আমি, পৃথিবীতে জন্মে এক জীবন কাটিয়ে দিলাম হেসেখেলে।মানুষের কোনো উপকারেই আসতে পারিনি, কিচ্ছু করে যেতে পারিনি মানুষের কল্যাণে। মৃত্যুর পর যদি একটা মানুষ আমার চোখে বিশ্ব দেখে, কারো বুকের ভেতর ধুকপুকানি হয়ে যদি বেঁচে থাকি আরো কিছুদিন, আমার কারণে যদি একটা মানুষও ফিরে পায় নতুন জীবন তবে তাই বা কম কি? অন্যভুবনে যেদিন পুনর্জীবিত হব তখন আমার কী হবে এ প্রশ্নও এখানে অবান্তর। যিনি আমাকে একবার সৃষ্টি করেছেন তিনি আমাকে প্রয়োজনে শতবার সৃষ্টি করতে পারেন। প্রয়োজন শুধু একটু leap of faith কারণ বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহুদূর। তার কাছ থেকে এসেছি, আবার ফিরে যাব তার কাছেই। তবে আর ভয় কেন?

 

 

Facebook Comments