রোজাও প্রতিবেশী – পর্ব -১ মোসলেম উদ্দীন Fasting and Neighbours, Engineer Moslem Uddin, Ottawa

119

রোজাও প্রতিবেশী – পর্ব -১ মোসলেম উদ্দীন Fasting and Neighbours, Engineer Moslem Uddin, Ottawa

আল্লাহ তায়ালা  বলেন, ‘তোমাদের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা তাকওয়া (আত্মশুদ্ধি) অর্জনে করতে পার। (সুরা বাকারা : আয়াত ১৮৩)

রোজার মাধ্যমেই মানবহৃদয়ে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি সৃষ্টি হয়। তাকওয়া অর্জন ও তাকওয়াভিত্তিক জীবন গঠনই সিয়াম সাধনার প্রধান উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ তায়ালা তাকওয়া অর্জনের উদ্দেশ্যেই রমজানের রোজাকে ফরজ বা আবশ্যকীয় করেছেন।তাকওয়া কী? তাকওয়া অর্থ হচ্ছে বাঁচা, আত্মরক্ষা করা, নিষ্কৃতি লাভ করা। অর্থাৎ আল্লাহর ভয় ও তার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অপরাধ, অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ, কথা ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম তাকওয়া। ঈমান ও তাকওয়া দ্বারা সমৃদ্ধ প্রশান্ত অন্তর আল্লাহর পক্ষ থেকে কল্যাণ ও অনুপ্রেরণা লাভ করে। এ ধরনের অন্তর একজন মানুষকে উত্তম চরিত্র দ্বারা সুসজ্জিত ক’রে পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করে। এ ধরনের লোক অন্যের জন্য কল্যাণ পছন্দ করে। আ ল্লাহর সাথে বান্দার এক অনাবিল সেতুবন্ধনের নাম তাকওয়া। তাকওয়া দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাধ্যমে পাপ বর্জন করা যায়।

আবার  কুরআন কারিমে সব ধরনের প্রতিবেশীর সাথে উত্তম আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,   তোমরা আল্লাহর উপাসনা কর ও কোন কিছুকে তাঁর অংশী করো না, এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন, অভাবগ্রস্ত, আত্মীয় ও অনাত্মীয় প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার কর। ( সূরা নিসা: ৩৬)

তাই প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া একজন মুসলমানের ঈমানের পরিপন্থী কাজ।  রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং পরকালে বিশ্বাস রাখে,সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়।(মিশকাত)
প্রতিবেশীর অধিকারের প্রসঙ্গে এক সাহাবী রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিজ্ঞাসা করেন,এ প্রতিবেশীর ওপর অপর প্রতিবেশীর কি অধিকার রয়েছে?রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম প্রশ্নের উত্তরে বললেন-

  • যদি এক প্রতিবেশী অপর প্রতিবেশীর নিকট ধার চায়, তাহলে তাকে কর্জ দেওয়া বা আর্থিকভাবে সাহায্য করা
  • যদি একে অপরকে দাওয়াত করে,তবে তা গ্রহণ করা
  • প্রতিবেশীর কেউ অসুস্থ হলে তার সেবা করা
  • যদি কখনো একে অপরের নিকট সাহায্য প্রার্থনা করে,তবে সাহায্য করা
  • প্রতিবেশীর বিপদের সময় দুঃখে সমবেদনা প্রকাশ করা
  • প্রতিবেশীর আনন্দের সময় তাকে অভিনন্দন জানানো
  • প্রতিবেশীর মৃত্যু হলে জানাযায় অংশগ্রহণ করা
  • প্রতিবেশীর অনুপস্থিতিতে তার বাড়ি-ঘর পরিবার-পরিজনের হিফাজত করা। প্রতিবেশীর অনুমতি ব্যতিত উঁচু বাড়ি নির্মাণ না করা।

এখন প্রশ্ন হল, রোজার  সময়  কিভাবে আমরা  প্রতিবেশীর হক আদায়ের মাধ্যমে রোজার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারব অর্থাৎ তাকওয়া অর্জন করতে পারব। নিম্নের বিভিন্ন উপায়ে আমার প্রতিবেশীর হক আদায়ের মাধ্যমে রোজার উদ্দেশ্য অর্জন করতে পারি।

প্রতিবেশীর কাছে নিজের পরিচিত তুলে ধরা:

প্রতিদিনের ব্যস্ততম জীবনের কারনে অনেক আমরা পাশের বাসর প্রতিবেশীকে চিনি না। অথচ বছরের পর পরে পাশাপাশি বাসায় অবস্থান করছি।অনেকে আবার লজ্জার পরিচিত হতে পারে না বা মন চাইলেও কিভাবে পরিচিত হতে হবে বুঝতে পারে না। ইসলামে অন্যের সাথে পরিচিত হওয়ার সহজ একটা উপায়  রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন।  আর সেটা হল সালামের প্রসার ঘটানো অর্থাৎ প্রতিবেশীকে বেশি বেশি সালাম দেওয়া।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস রা. থেকে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলেন, ইসলামের কোন কাজটি সর্বোত্তম? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললে, খাবার খাওয়ানো এবং পরিচিত অপরিচিত সকলকে সালাম দেয়া।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-“ ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না,   ঈমানদার হও। আবার ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা  ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ না পরস্পরকে ভালোবাস। আমি কি তোমাদের এমন একটি বিষয়ের কথা বলে দেব না, যা করলে পরস্পরের ভালোবাসা সৃষ্টি হবে? আর তা হলো, তোমরা পরস্পরের মাঝে সালামের ব্যাপক প্রসার ঘটাও”।

রোজার সময় আমরা প্রতিবেশীর মাধ্যমে এই আমল করার সুযোগ গ্রহণ করতে পারি।

প্রতিবেশীর প্রতি দয়ার্দ্র হওয়া:

রাসূল (সাঃ) বলেন “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করে”।অন্যত্র তিনি বলেন, তুমি তোমার প্রতিবেশীর সাথে উত্তম ব্যবহার কর, তাহ’লে তুমি মুমিন হ’তে পারবে’।

প্রতিবেশীর সাথে সদাচরণ করার মধ্যেই আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ)-এর ভালবাসা নিহিত আছে। রাসূল (সাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালবাসা পেতে ইচ্ছা করে সে যেন সদা সত্য কথা বলে, আমানত রক্ষা করে এবং প্রতিবেশীর উপকার করে’।

রোজার দিনে গ্রীষ্মের গরমের কারনে অনেকের বাজারে যেতে  কষ্ট  হয়, আমরা তাদেরকে বাজার এনে দিতে সাহায্য করতে পারি।

আমাদের যাদের গাড়ী আছে  তারা বাজারে যাওয়ার সময় তাদেরকে সঙ্গে নিয়ে পারি।  প্রতিবেশীর ছেলেমেয়েদেরকে  স্কুলে  আনা নেওয়ায় সাহায্য করতে পারি। র সজিদে যাওয়ার সময় তাদেরকে সঙ্গে নিত  পারি।   এমনিভাবে বহু উপায়ে  তাদের প্রতি সদয়  হতে পারি।

জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি রহমত করে না, আল্লাহ তার প্রতি রহমত করেন না (বোখারি ও মুসলিম থেকে মিশকাতে)।

মুহাদ্দিসগণ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া অনুগ্রহ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা করে না, আল্লাহতায়ালার পূর্ণ রহমত হতে সে ব্যক্তি বঞ্চিত থাকে। কেননা সৃষ্টির সেবার মাঝেই স্রষ্টার অনুগ্রহ নিহিত। যেহেতু আল্লাহতায়ালার রহমত সর্বজনীন, তাই তাঁর রহমত বাধ্য-অবাধ্য-নির্বিশেষে সবার প্রতি সমভাবে অবারিত। সেই হিসাবে ‘আল্লাহ তার প্রতি রহমত করেন না’ কথাটির অর্থ হলো, সে আল্লাহতায়ালার পূর্ণ রহমত থেকে বঞ্চিত হবে এবং রহমত লাভে অগ্রগণ্য হবে না।

প্রতিবেশীর সাথে বিনয়ের সাথে কথা বলা:

আবূ শুরায়হ খু্যায়ী (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার কর। যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহেমানের খাতির করে। এবং যে ব্যাক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভাল কথা বলে, অথবা নীরব থাকে।”

আবূ হুরায়রা (রাঃ) হ’তে বর্ণিত একদা জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)‘অমুক মহিলা অধিক ছালাত পড়ে, ছিয়াম রাখে এবং দান-ছাদাক্বাহ করার ব্যাপারে প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখের দ্বারা স্বীয় প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! অমুক মহিলা সম্পর্কে জনশ্রুতি আছে যে, সে কম ছিয়াম পালন করে, দান-ছাদাক্বাও কম করে এবং ছালাতও কম আদায় করে। তার দানের পরিমাণ হ’ল পনীরের টুকরা বিশেষ। কিন্তু সে নিজের মুখ দ্বারা স্বীয় প্রতিবেশীদেরকে কষ্ট দেয় না। তিনি বললেন, সে জান্নাতী’।

হজরত আবু হুরায়রা [রা.] থেকে বর্ণিত নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ [সা.] বলেছেন, দানের সম্পদ কমে না। ক্ষমার দ্বারা আল্লাহ তার বান্দার ইজ্জত ও সম্মান বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কিছুই করেন না। আর সে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে বিনয় নম্রতা নীতি অবলম্বন করে, আল্লাহ তার মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।

রোজা এবং রোজার বাইরে প্রতিবেশীর সাথে কথা বলার সময় কোনো রকম অহংকারী বা উগ্রতার ভাব দেখাবো না।  প্রতিবেশী যতই ক্ষুদ্র কাজ করুক না কেন তাকে ছোট করে দেখব না।  হাসিমুখে অমায়িকভাবে তাদের সাথে আচরণ করব।

আমার যখন বিনয় ও নম্রতা অবলম্বন করে তখন আমাদের তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে  মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন।(-চলবে)

Facebook Comments